রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে ইউক্রেনকে এত দিন সামরিক, আর্থিক ও মানবিক সহায়তা দিয়ে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলো। কিন্তু ওয়াশিংটনের সহায়তা কমে গেলে কিয়েভকে কত দিন একই মাত্রায় সমর্থন দিতে পারবে ইউরোপ—এ প্রশ্ন এখন নতুন করে সামনে এসেছে। ইউরোপীয় দেশগুলো সহায়তা বাড়ানোর চেষ্টা করলেও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, সামরিক সক্ষমতার ঘাটতি এবং আসন্ন নির্বাচন এই প্রতিশ্রুতিকে জটিল করে তুলছে।
রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণ শুরুর পর থেকে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা, রাষ্ট্রীয় ব্যয় এবং জরুরি পরিষেবা সচল রাখতে বিপুল অর্থ প্রয়োজন হয়েছে। ইউরোপ ইতিমধ্যে বড় অঙ্কের সহায়তা দিয়েছে। তবে অর্থের পরিমাণ বেশি হলেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত সহায়তার সব দিক পূরণ করা সম্ভব হয় না।
সহায়তার হিসাবে ইউরোপ এগিয়েছে, কিন্তু ঘাটতি রয়ে গেছে
ইউক্রেনকে সহায়তার ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি যুক্তরাজ্য, নরওয়ে এবং অন্যান্য ইউরোপীয় দেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ২০২২ সাল থেকে ২০২৬ সালের বসন্ত পর্যন্ত ইউরোপের সম্মিলিত আর্থিক, সামরিক ও মানবিক সহায়তার পরিমাণ প্রায় ২৩৬ বিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছেছে বলে একটি আন্তর্জাতিক সহায়তা-পর্যবেক্ষণ হিসাব জানিয়েছে। একই সময়ের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার পরিমাণ ছিল প্রায় ১১৫ বিলিয়ন ইউরো।
এই অঙ্কগুলো দেখায়, ইউক্রেনকে সমর্থন দেওয়ার ক্ষেত্রে ইউরোপের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিভিন্ন ধরনের সহায়তার হিসাব এক নয়। কোনো সহায়তা সরাসরি অর্থ, কোনোটি অস্ত্র ও গোলাবারুদ, আবার কোনোটি ঋণ, প্রশিক্ষণ বা মানবিক সহায়তা হিসেবে দেওয়া হয়। তাই মোট অঙ্ক দিয়ে তাৎক্ষণিক সামরিক সক্ষমতার সম্পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও সদস্যদেশগুলো ইউক্রেনের জন্য নতুন আর্থিক সহায়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি ঋণব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু এসব অর্থের কতটা দ্রুত ব্যবহার করা যাবে এবং সামরিক চাহিদা কতটা পূরণ হবে, তা নির্ভর করছে বাস্তবায়নের গতি ও সদস্যদেশগুলোর সমন্বয়ের ওপর।
যুক্তরাষ্ট্রের কোন সহায়তা সহজে প্রতিস্থাপন করা যাবে না
ইউক্রেনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা শুধু অর্থ বা অস্ত্র সরবরাহে সীমাবদ্ধ নয়। গোয়েন্দা তথ্য, স্যাটেলাইটভিত্তিক নজরদারি, উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা এবং নির্দিষ্ট সামরিক প্রযুক্তিতে মার্কিন সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ।
ইউরোপের দেশগুলোর নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প থাকলেও সব ধরনের সরঞ্জাম দ্রুত উৎপাদন ও সরবরাহ করার সক্ষমতা সমান নয়। বিশেষ করে উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা, নির্ভুল লক্ষ্য নির্ধারণ এবং যুদ্ধক্ষেত্রের তথ্য বিশ্লেষণে ঘাটতি তৈরি হলে ইউক্রেনের সামরিক পরিকল্পনায় চাপ পড়তে পারে।
ইউরোপকে তাই একদিকে অর্থ ও অস্ত্রের সরবরাহ বজায় রাখতে হবে, অন্যদিকে নিজেদের প্রতিরক্ষা উৎপাদন বাড়াতে হবে। এই পরিবর্তন এক দিনে সম্ভব নয়; কারখানার উৎপাদনক্ষমতা, সরবরাহব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ এবং বাজেট পরিকল্পনায় সময় প্রয়োজন।
ইউরোপের ভেতরেও রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে
ইউক্রেনকে সহায়তার ভবিষ্যৎ শুধু সামরিক চাহিদার ওপর নির্ভর করছে না। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি ঋণ, আবাসনসংকট এবং জনসেবার মান নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। এসব পরিস্থিতিতে সরকারগুলোর জন্য বিদেশে বড় অঙ্কের সহায়তা বজায় রাখা রাজনৈতিকভাবে কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
ইউরোপের উত্তরাঞ্চল ও বাল্টিক অঞ্চলের কয়েকটি দেশ জাতীয় আয়ের তুলনায় ইউক্রেনকে উল্লেখযোগ্য সহায়তা দিয়েছে। কিন্তু বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে সহায়তার মাত্রা এক নয়। ফলে ইউরোপের ভেতরে কে কতটা আর্থিক ও সামরিক দায়িত্ব নেবে, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
আসন্ন নির্বাচনও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো দেশে নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে ইউক্রেননীতি বদলে যেতে পারে। আবার অন্য দেশগুলো রাশিয়ার নিরাপত্তা হুমকি বিবেচনায় সহায়তা অব্যাহত রাখার পক্ষে অবস্থান নিতে পারে।
কত দিন সহায়তা দিতে পারবে ইউরোপ?
এর নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই। ইউক্রেনকে ইউরোপ কত দিন সমর্থন করতে পারবে, তা নির্ভর করবে যুদ্ধের তীব্রতা, সদস্যদেশগুলোর বাজেট, অস্ত্র উৎপাদনের গতি, রাজনৈতিক ঐকমত্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার ওপর।
ইউরোপের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক ও মানবিক সহায়তা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সব সামরিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা দ্রুত প্রতিস্থাপন করা কঠিন। অন্যদিকে, ইউরোপ যদি যৌথভাবে অস্ত্র উৎপাদন বাড়ায়, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নিশ্চিত করে এবং সদস্যদেশগুলোর মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে নেয়, তাহলে সহায়তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার সুযোগ বাড়বে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু ইউরোপের অর্থ আছে কি না, তা নয়। বরং ইউক্রেনকে সমর্থন দেওয়ার জন্য ইউরোপীয় দেশগুলো কত দিন রাজনৈতিক ঐকমত্য ধরে রাখতে পারে এবং নিজেদের সামরিক সক্ষমতা কত দ্রুত বাড়াতে পারে—সেটিই হয়ে উঠছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
