কখনও কখনও একটি পোশাক শুধু পোশাক থাকে না। হয়ে ওঠে একটি সময়ের প্রতীক, একটি ব্যক্তিত্বের পরিচয় কিংবা এমন একটি মুহূর্তের স্মারক, যেটি বহু বছর পরও মানুষের মনে থেকে যায়। ব্রিটিশ রাজপরিবারের ইতিহাসে প্রিন্সেস ডায়ানার বিখ্যাত কালো পোশাকটি ঠিক তেমনই একটি পোশাক।
‘রিভেঞ্জ ড্রেস’ নামে পরিচিত সেই পোশাকটি প্রায় তিন দশক পর আবার নিলামে উঠতে যাচ্ছে। আগামী ৯ ডিসেম্বর নিউইয়র্কে সোথেবির নিলামে এটি বিক্রি হওয়ার কথা। নিলাম প্রতিষ্ঠানটির ধারণা, পোশাকটির দাম উঠতে পারে ১ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ মার্কিন ডলারের মধ্যে।
তবে এই পোশাকের গল্প শুধু এর সম্ভাব্য দামের কারণে আকর্ষণীয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ডায়ানার জীবনের একটি আলোচিত রাত এবং রাজপরিবারের ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় একটি মুহূর্ত।
যে রাতে বদলে গেল সবকিছু
১৯৯৪ সালের ২৯ জুন। লন্ডনের সার্পেন্টাইন গ্যালারিতে একটি অনুষ্ঠানে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ডায়ানা। তখন তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমে তীব্র আগ্রহ। এর মধ্যেই টেলিভিশনে প্রচারিত একটি সাক্ষাৎকারে তৎকালীন প্রিন্স চার্লস দাম্পত্য জীবনে অবিশ্বস্ততার কথা স্বীকার করেন।
সেই রাতে ডায়ানা চাইলে অনুষ্ঠানে না-ও যেতে পারতেন। চাইলে তুলনামূলক সাধারণ পোশাক পরেও উপস্থিত হতে পারতেন। কিন্তু তিনি বেছে নিলেন একটি কালো, কাঁধ খোলা, শরীরের সঙ্গে মানানসই সিল্কের পোশাক।
পোশাকটির নকশা করেছিলেন গ্রিক বংশোদ্ভূত ডিজাইনার ক্রিস্টিনা স্ট্যামবোলিয়ান। ডায়ানার কাছে পোশাকটি আগে থেকেই ছিল, কিন্তু এতদিন সেটিকে প্রকাশ্যে পরার জন্য কিছুটা সাহসী মনে করা হয়েছিল। সেই রাতেই পোশাকটি আলমারি থেকে বেরিয়ে আসে।
ডায়ানার সঙ্গে ছিল মুক্তা ও নীলকান্তমণির চোকার, কালো জুতা এবং ছোট একটি ব্যাগ। রাজপরিবারের প্রচলিত পোশাকের তুলনায় পুরো সাজটিই ছিল অনেক বেশি আধুনিক ও আত্মবিশ্বাসী।
পরদিন থেকেই ছবিটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
কেন নাম হলো ‘রিভেঞ্জ ড্রেস’?
ডায়ানা নিজে পোশাটির নাম ‘রিভেঞ্জ ড্রেস’ দেননি। পরবর্তীতে সংবাদমাধ্যম ও জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে এই নামটি ছড়িয়ে পড়ে।
কারণটি ছিল পোশাকটির সময় নির্বাচন।
চার্লসের ব্যক্তিগত জীবনের বিতর্ক যখন জনসমক্ষে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, ঠিক সেই রাতেই ডায়ানা এমন একটি পোশাকে জনসমক্ষে এলেন, যা ছিল আত্মবিশ্বাসী, আকর্ষণীয় এবং রাজকীয় পোশাকের প্রচলিত ধারণা থেকে অনেকটাই আলাদা।
তাই পোশাকটিকে অনেকেই প্রতিশোধের প্রতীক হিসেবে দেখেছেন। তবে ফ্যাশন ইতিহাসবিদদের কাছে এর অর্থ আরও গভীর। তাদের মতে, এটি ছিল নিজের গল্পের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেওয়ার একটি মুহূর্ত।
ডায়ানা যেন নিজের পোশাকের মাধ্যমেই জানিয়ে দিয়েছিলেন—তার ব্যক্তিগত জীবনের সংকট তাকে জনসমক্ষে দুর্বল করে দেবে না।
ডায়ানার ফ্যাশনে নতুন অধ্যায়ের শুরু
রিভেঞ্জ ড্রেসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত এখানেই।
ডায়ানাকে দীর্ঘদিন ধরে রাজপরিবারের নিয়মকানুন মেনে চলা একজন তরুণী হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু চার্লসের সঙ্গে বিচ্ছেদের পর ধীরে ধীরে তার পোশাকে পরিবর্তন আসে। আরও আধুনিক, আত্মবিশ্বাসী এবং ব্যক্তিত্বনির্ভর পোশাক বেছে নিতে শুরু করেন তিনি।
১৯৯৪ সালের সেই রাতটি যেন সেই পরিবর্তনের প্রকাশ্য ঘোষণা হয়ে ওঠে।
পরে ডায়ানাকে আরও সাহসী ডিজাইনের পোশাকে দেখা যায়। ফ্যাশন জগতেও তার প্রভাব ক্রমশ বাড়তে থাকে। তার পোশাক কেবল রাজপরিবারের সদস্য হিসেবে তার পরিচয় বহন করেনি, বরং একজন স্বতন্ত্র নারী হিসেবেও তার ব্যক্তিত্বকে সামনে এনেছিল।
এ কারণেই কয়েক দশক পরও রিভেঞ্জ ড্রেস নিয়ে আগ্রহ কমেনি।
নিলামে পোশাকটি কতবার উঠেছে?
মজার বিষয় হলো, এবারই প্রথম নয়।
১৯৯৭ সালে মৃত্যুর মাত্র কয়েক মাস আগে ডায়ানা নিজের ৭৯টি পোশাক দাতব্য নিলামে তুলেছিলেন। সেখানেই রিভেঞ্জ ড্রেসটি বিক্রি হয়। সেই নিলাম থেকে পাওয়া অর্থ ক্যানসার ও এইডস-সংক্রান্ত দাতব্য কাজে ব্যবহৃত হয়েছিল। পোশাকটি প্রায় ৪০ হাজার পাউন্ডে কিনেছিলেন স্কটল্যান্ডের ব্রিজ ও গ্রেম ম্যাকেঞ্জি দম্পতি। এরপর প্রায় তিন দশক ধরে এটি তাদের সংগ্রহেই ছিল।
এবারের নিলামেও দাতব্য উদ্দেশ্য থাকছে। বিক্রির অর্থের একটি অংশ এনএইচএস লোথিয়ান চ্যারিটির মাধ্যমে রয়্যাল হাসপাতাল অব এডিনবার্গের কাজে যাবে।
আবারও মানুষের সামনে আসছে সেই পোশাক
নিলামের আগে পোশাকটি বিভিন্ন শহরে প্রদর্শন করা হবে। লন্ডন থেকে শুরু করে হংকং ও জেনেভা হয়ে এটি নিউইয়র্কে যাবে। সেখানে ডিসেম্বরের নিলামে নতুন মালিকের হাতে উঠবে ডায়ানার ইতিহাসের এই বিখ্যাত স্মারক।
তিন দশক পরও একটি পোশাককে ঘিরে এত আগ্রহ দেখায়, ডায়ানা কেন আজও এত প্রভাবশালী—তার উত্তরও যেন এই কালো পোশাকের মধ্যেই লুকিয়ে আছে।
এটি শুধু একজন রাজকুমারীর পরা পোশাক নয়। এটি এমন এক সময়ের ছবি, যখন ব্যক্তিগত কষ্টের মধ্যেও একজন নারী নিজের আত্মবিশ্বাস, ব্যক্তিত্ব এবং স্বাধীনতাকে সামনে এনেছিলেন।
সম্ভবত সে কারণেই রিভেঞ্জ ড্রেসের গল্প এখনও শেষ হয়নি। এবার নিলামের হাত ধরে তার গল্পের নতুন একটি অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে।
