কম্পিউটারের গতি বাড়াতে এত দিন মূল ভরসা ছিল আরও ছোট ট্রানজিস্টর, আরও শক্তিশালী প্রসেসর এবং আরও উন্নত চিপ। কিন্তু প্রযুক্তির পরবর্তী বড় পরিবর্তন হয়তো আসতে পারে আরও মৌলিক জায়গা থেকে—বিদ্যুতের বদলে আলো ব্যবহার করে তথ্য পরিবহনের মাধ্যমে। ডেনমার্কের টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির গবেষকদের তৈরি অতি ক্ষুদ্র ন্যানোলেজার সেই সম্ভাবনাকেই নতুন করে সামনে এনেছে। বিজ্ঞানীদের দাবি, একই চিপে হাজার হাজার এমন লেজার বসানো সম্ভব হতে পারে, যা ভবিষ্যতের কম্পিউটারকে দ্রুততর ও কম বিদ্যুৎনির্ভর করার পথ খুলে দিতে পারে।
সেপ্টেম্বরের সাম্প্রতিক গবেষণা-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন ন্যানোলেজার এতটাই ছোট যে একটি চিপে বিপুলসংখ্যক লেজার একসঙ্গে স্থাপন করা সম্ভব। এর মাধ্যমে চিপের ভেতরে বৈদ্যুতিক সংকেতের পরিবর্তে আলোর সাহায্যে তথ্য পরিবহনের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। প্রযুক্তিটি বাস্তবে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা গেলে কম্পিউটিংয়ের শক্তি খরচ প্রায় অর্ধেক পর্যন্ত কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
কেন বিদ্যুতের বদলে আলো?
আজকের কম্পিউটার মূলত ইলেকট্রনের চলাচলের মাধ্যমে তথ্য প্রক্রিয়াকরণ ও পরিবহন করে। এই পদ্ধতি অত্যন্ত কার্যকর হলেও চিপ যত শক্তিশালী হচ্ছে, ততই তাপ ও বিদ্যুৎ খরচ বড় সমস্যা হয়ে উঠছে।
বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য ব্যবহৃত ডেটা সেন্টারগুলোতে বিপুল পরিমাণ তথ্য এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরাতে হয়। সেখানে শুধু গণনার জন্য নয়, তথ্য পরিবহনের জন্যও উল্লেখযোগ্য শক্তি প্রয়োজন হয়। বৈদ্যুতিক তার ও সংযোগে প্রতিরোধ এবং তাপ উৎপন্ন হওয়ায় ভবিষ্যতের আরও শক্তিশালী কম্পিউটার তৈরিতে এটি বড় সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে।
আলো ব্যবহার করলে সেই সীমাবদ্ধতার একটি অংশ কমানো সম্ভব। ফাইবার-অপটিক যোগাযোগ ইতিমধ্যেই দেখিয়েছে, আলো ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ তথ্য দ্রুত পরিবহন করা যায়। এখন বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য সেই ধারণাকে চিপের ভেতরেই নিয়ে আসা।
একটি চিপে হাজারো লেজার কেন গুরুত্বপূর্ণ
ন্যানোলেজারের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর আকার। প্রচলিত লেজারের তুলনায় এটি অত্যন্ত ক্ষুদ্র। ফলে একই সিলিকন চিপে অনেকগুলো আলোর উৎস বসানো সম্ভব।
প্রতিটি ন্যানোলেজারকে যদি তথ্য পরিবহনের একটি ক্ষুদ্র পথ হিসেবে ব্যবহার করা যায়, তাহলে একটি চিপের ভেতরেই বিপুলসংখ্যক সমান্তরাল আলোক-সংযোগ তৈরি করা সম্ভব হবে। এর ফলে তথ্য পরিবহনের গতি বাড়তে পারে এবং শক্তি ব্যবহারের দক্ষতাও উন্নত হতে পারে।
ডেনমার্কের গবেষকদের তৈরি ন্যানোলেজার নিয়ে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি ডেটা সেন্টার, স্মার্টফোন এবং উন্নত চিকিৎসা সেন্সরের মতো ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যেতে পারে।
তাহলে কি পুরো কম্পিউটারই আলোয় চলবে?
এখানেই বাস্তবতার সঙ্গে কল্পনার পার্থক্য রয়েছে। ন্যানোলেজার বা ফোটোনিক প্রযুক্তির অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ হলেও আগামীকাল থেকেই সব কম্পিউটার বিদ্যুৎ বাদ দিয়ে আলোয় চলবে—এমন নয়।
কম্পিউটারের অনেক কাজ এখনো ইলেকট্রনিক সার্কিটের ওপর নির্ভরশীল। আলোর মাধ্যমে তথ্য পরিবহন বা নির্দিষ্ট ধরনের গণনা করা সম্ভব হলেও সম্পূর্ণ অপটিক্যাল কম্পিউটার তৈরি করতে আলো ও ইলেকট্রনিক্সের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।
তবে গবেষণার অগ্রগতি দেখাচ্ছে, ভবিষ্যতের চিপ হয়তো পুরোপুরি বৈদ্যুতিক বা পুরোপুরি আলোকনির্ভর না হয়ে দুই প্রযুক্তির সমন্বিত রূপ নিতে পারে। অর্থাৎ যেখানে ইলেকট্রনিক্স প্রয়োজন সেখানে ইলেকট্রন, আর দ্রুত তথ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে ফোটন বা আলোর ব্যবহার হতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য বড় পরিবর্তন
এই প্রযুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাব্য ব্যবহার হতে পারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায়। আধুনিক এআই মডেল চালাতে বিপুল পরিমাণ গণনা ও ডেটা স্থানান্তর প্রয়োজন হয়। ফলে এআই ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ খরচ দ্রুত বাড়ছে।
চিপের ভেতরে আলো ব্যবহার করে তথ্য দ্রুত সরানো গেলে এআইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় গণনাকাঠামো আরও শক্তি-সাশ্রয়ী হতে পারে। অন-চিপ ফোটোনিক নিউরাল নেটওয়ার্ক নিয়েও গবেষণা চলছে, যেখানে আলোর বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করে মেশিন লার্নিংয়ের শক্তি খরচ কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
বড় চ্যালেঞ্জও আছে
তবে গবেষণাগার থেকে বাজারে যাওয়ার পথ সহজ নয়। ন্যানোলেজারকে নির্ভরযোগ্যভাবে তৈরি করা, সিলিকন চিপের সঙ্গে সমন্বয় করা, উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা—সবই বড় চ্যালেঞ্জ।
আরেকটি সমস্যা হলো আলোকে ব্যবহারযোগ্য বৈদ্যুতিক তথ্যের সঙ্গে বারবার রূপান্তর করতে হলে সেই প্রক্রিয়াতেও শক্তি লাগে। তাই শুধু আলো ব্যবহার করলেই যে পুরো কম্পিউটার স্বয়ংক্রিয়ভাবে শক্তি-সাশ্রয়ী হয়ে যাবে, তা নয়।
তারপরও একটি চিপে হাজারো ক্ষুদ্র লেজার বসানোর সম্ভাবনা কম্পিউটার স্থাপত্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন দরজা খুলছে। আগামী দিনের কম্পিউটার হয়তো শুধু দ্রুততর হবে না; তার ভেতরে তথ্য চলাচলের ভাষাটিও বদলে যেতে পারে।
ইলেকট্রনের যুগের পর ফোটনের যুগ পুরোপুরি আসবে কি না, তার উত্তর এখনো ভবিষ্যতের হাতে। কিন্তু ন্যানোলেজারের অগ্রগতি অন্তত একটি বিষয় পরিষ্কার করছে—কম্পিউটারের ভবিষ্যৎ হয়তো শুধু আরও ছোট ট্রানজিস্টরে নয়, আলোকে আরও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ব্যবহার করার মধ্যেও লুকিয়ে আছে।
