দক্ষিণ আমেরিকার খনিজ সম্পদকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন কৌশলগত সমীকরণ। বিশ্বের জ্বালানি রূপান্তর ও বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা লিথিয়াম ও তামার সরবরাহে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে যৌথ উদ্যোগ নিয়েছে চিলি, আর্জেন্টিনা, বলিভিয়া ও পেরু। ২৮ আগস্ট চার দেশ কৌশলগত খনিজ নিয়ে একটি যৌথ ঘোষণায় সই করেছে।
এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য শুধু খনিজ উত্তোলন নয়; বরং গবেষণা, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করা। চার দেশ মনে করছে, বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থা যখন জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে এগোচ্ছে, তখন লিথিয়াম ও তামার মতো খনিজের চাহিদা দ্রুত বাড়বে।
লিথিয়াম বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি এবং শক্তি সংরক্ষণ প্রযুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। অন্যদিকে তামা ব্যবহার হয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন, বৈদ্যুতিক গাড়ি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি অবকাঠামোসহ অসংখ্য প্রযুক্তিতে। ফলে আগামী দিনের সবুজ অর্থনীতিতে এই দুটি খনিজকে ঘিরে প্রতিযোগিতা আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
চিলি ও আর্জেন্টিনা বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ লিথিয়াম উৎপাদক। বলিভিয়াতেও রয়েছে বিপুল লিথিয়াম সম্পদ। পেরু আবার বিশ্বের অন্যতম বড় তামা উৎপাদনকারী দেশ। ফলে চার দেশের একসঙ্গে কাজ করার সিদ্ধান্তকে আঞ্চলিক খনিজ শক্তির একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চুক্তির আওতায় চার দেশ আন্তর্জাতিক আর্থিক ও বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহায়তা নেওয়ার চেষ্টা করবে। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে গবেষণা, উদ্ভাবন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়ার কথা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই জোট সফল হলে দক্ষিণ আমেরিকা শুধু কাঁচা খনিজ সরবরাহকারী অঞ্চল হিসেবে নয়, বরং বৈশ্বিক পরিচ্ছন্ন জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠতে পারে।
তবে বড় প্রশ্ন হচ্ছে—এই দেশগুলো কি শুধু খনিজ উত্তোলন করবে, নাকি ব্যাটারি ও অন্যান্য উচ্চমূল্যের পণ্য তৈরির শিল্পও নিজেদের অঞ্চলে গড়ে তুলতে পারবে? কারণ কাঁচামাল রপ্তানির পরিবর্তে স্থানীয়ভাবে প্রক্রিয়াজাতকরণ করতে পারলে অর্থনৈতিক লাভ অনেক বেশি হতে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বড় অর্থনীতিগুলো ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। তাই দক্ষিণ আমেরিকার এই নতুন উদ্যোগ শুধু অর্থনৈতিক নয়, ভূরাজনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
