দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থাকার পর ক্যামেরুনে ফিরেছেন প্রেসিডেন্ট পল বিয়া। কিন্তু তাঁর প্রত্যাবর্তন দেশটির রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দূর করতে পারেনি। বরং ৯৩ বছর বয়সী এই নেতার শারীরিক সক্ষমতা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। চার দশকের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা বিয়ার অনুপস্থিতিতে যেমন তাঁর স্বাস্থ্য নিয়ে নানা জল্পনা তৈরি হয়েছিল, তেমনি দেশে ফেরার পরও সরকার পরিচালনার বাস্তব সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
১৯৮২ সাল থেকে ক্যামেরুনের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বিয়া। আফ্রিকার দীর্ঘতম সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা নেতাদের মধ্যে তিনি অন্যতম। গত বছরের বিতর্কিত নির্বাচনে অষ্টম মেয়াদে জয়ী হওয়ার পর তাঁর নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি, বিরোধীদের অভিযোগ এবং দীর্ঘ সময় ধরে নতুন সরকার গঠন না হওয়া রাজনৈতিক অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়েছে।
দীর্ঘ অনুপস্থিতির পর দেশে ফেরা
২০২৬ সালের ২০ আগস্ট দেশে ফেরেন বিয়া। এর আগে তিনি ৭৪ দিন ক্যামেরুনের বাইরে ছিলেন। তাঁর দপ্তর বিদেশে অবস্থানকে ব্যক্তিগত সফর হিসেবে বর্ণনা করলেও দীর্ঘ অনুপস্থিতি জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি করে। তাঁর স্বাস্থ্য নিয়ে গুজব ছড়িয়ে পড়ে; এমনকি তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বা তিনি মারা গেছেন—এমন দাবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ায়। সরকার অবশ্য এসব জল্পনা নাকচ করে।
দেশে ফেরার সময় ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকেরা তাঁকে স্বাগত জানান। কিন্তু তাঁর উপস্থিতির প্রকাশিত ছবি ও সংক্ষিপ্ত দৃশ্য অনেকের উদ্বেগ দূর করতে পারেনি। সমালোচকদের প্রশ্ন, প্রেসিডেন্ট নিয়মিত ও কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছেন কি না, তা বোঝার মতো যথেষ্ট তথ্য জনসমক্ষে রয়েছে কি না।
সরকারি সিদ্ধান্তে ধীরগতি
বিয়ার দেশে ফেরার পরও প্রশাসনে বড় ধরনের পরিবর্তনের ঘোষণা আসেনি। নির্বাচনে পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পর নতুন মন্ত্রিসভা গঠন এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এখনো অনিশ্চিত। দীর্ঘ সময় ধরে একই প্রশাসনিক কাঠামো বহাল থাকায় সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ক্যামেরুনের সংবিধান ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় প্রেসিডেন্টের হাতে ব্যাপক ক্ষমতা রয়েছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ ও নীতিগত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু রাষ্ট্রপ্রধানের কার্যক্রম দৃশ্যমান না হলে প্রশাসনের বিভিন্ন অংশের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য, সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিয়া দীর্ঘদিন ধরেই অনেক প্রশাসনিক কাজ মন্ত্রী ও ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের মাধ্যমে পরিচালনা করে আসছেন। তবে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তাঁর সরাসরি ভূমিকা কতটা রয়েছে, তা নিয়ে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে।
কে হতে পারেন উত্তরসূরি?
ক্যামেরুনের রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্নগুলোর একটি হলো, বিয়ার পর কে নেতৃত্ব দেবেন। তাঁর বয়স এবং দীর্ঘ শাসনকাল উত্তরসূরি নির্ধারণের বিষয়টিকে আরও জরুরি করেছে। সম্ভাব্য নেতৃত্ব নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন অংশে আগ্রহ ও প্রতিযোগিতা রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
দেশটিতে স্থায়ীভাবে দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম একজন ভাইস প্রেসিডেন্ট নিয়োগের দাবিও উঠেছে। এমন পদে কাউকে নিয়োগ দেওয়া হলে ভবিষ্যৎ ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ কিছুটা স্পষ্ট হতে পারে। তবে বিয়া এখনো এমন কোনো ঘোষণা দেননি, যা উত্তরসূরি প্রশ্নে অনিশ্চয়তা দূর করতে পারে।
রাজনৈতিক ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত উত্তরসূরি নির্ধারণের প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে প্রশাসনের ধারাবাহিকতা, নিরাপত্তা পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক নীতি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্থিতিশীলতাও জড়িত।
নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক ও বিরোধীদের অবস্থান
গত বছরের নির্বাচনে বিয়ার পুনর্নির্বাচন নিয়ে বিরোধীরা আপত্তি জানিয়েছিল। বিরোধী নেতা ইসা তচিরোমা বাকেরি নিজেকে বিজয়ী দাবি করেন। নির্বাচন-পরবর্তী বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপের অভিযোগও ওঠে। মানবাধিকারকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সহিংসতায় বহু মানুষ নিহত হন। বিরোধী নেতা তচিরোমা পরে দেশ ছেড়ে গাম্বিয়ায় আশ্রয় নেন।
দেশটিতে নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জও রয়েছে। উত্তরে সশস্ত্র গোষ্ঠী বোকো হারামের তৎপরতা এবং পশ্চিমাঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংঘাত দীর্ঘদিন ধরে সরকারের জন্য সমস্যা তৈরি করছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে।
ফিরেছেন প্রেসিডেন্ট, কাটেনি অনিশ্চয়তা
বিয়ার দেশে ফেরা আপাতদৃষ্টিতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার বার্তা দিলেও বাস্তব প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো মেলেনি। নতুন মন্ত্রিসভা কবে হবে, ভাইস প্রেসিডেন্ট নিয়োগ দেওয়া হবে কি না এবং রাষ্ট্রপ্রধান কতটা সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালন করবেন—এসব বিষয়ে স্পষ্টতা প্রয়োজন।
দীর্ঘ শাসনের পর ক্যামেরুন এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা ও শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া কঠিন। বিয়ার প্রত্যাবর্তনের পর দেশটির মানুষ তাই শুধু তাঁর উপস্থিতি নয়, কার্যকর শাসন, স্বচ্ছতা এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পথনির্দেশেরও অপেক্ষায় রয়েছেন।
