কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতে নির্মাণাধীন একটি বহুতল ভবন ধসে পড়ে প্রাণহানির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, শহরের জনবহুল ইস্টলেই এলাকায় ঘটে এ দুর্ঘটনা। মুহূর্তের মধ্যে ভবনটি ধসে পড়ায় চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে কংক্রিট, লোহার রড ও নির্মাণসামগ্রীর বিশাল স্তূপ। ঘটনার পরপরই উদ্ধারকর্মীরা অভিযান শুরু করেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষদের জীবিত উদ্ধারের আশায় তল্লাশি অব্যাহত রয়েছে।
সোমবার পর্যন্ত চারজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। তবে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন হিসাব পাওয়া যাচ্ছে। কেনিয়া রেড ক্রসের হিসাবে, ৪৭ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। উদ্ধারকারীরা আশঙ্কা করছেন, ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও মানুষ আটকে থাকতে পারেন। সময় যত গড়াচ্ছে, নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারগুলোর উদ্বেগও তত বাড়ছে।
ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকায় মুহূর্তেই বিপর্যয়
ইস্টলেই নাইরোবির অন্যতম জনবহুল বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকা। এখানে অসংখ্য দোকান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, আবাসিক ভবন এবং নির্মাণাধীন স্থাপনা রয়েছে। দুর্ঘটনার সময় ভবনটির নিচতলা ও বেসমেন্টের কয়েকটি দোকান চালু ছিল বলে জানা গেছে। ফলে ভবন ধসে পড়ার পর সেখানে থাকা মানুষদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ভবনটি ধসে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে ধুলার বিশাল মেঘ ছড়িয়ে পড়ে। আশপাশের মানুষ নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পরে স্থানীয় বাসিন্দা, পুলিশ ও উদ্ধারকর্মীরা ঘটনাস্থলে জড়ো হন। তবে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ভবনটি অন্য স্থাপনার কাছাকাছি থাকায় উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা সহজ ছিল না।
জীবিতদের খোঁজে বিশেষ সরঞ্জাম
ধ্বংসস্তূপের ভেতরে কেউ জীবিত আছেন কি না, তা শনাক্ত করতে উদ্ধারকারীরা বিভিন্ন প্রযুক্তি ও বিশেষ সরঞ্জাম ব্যবহার করছেন। অনুসন্ধানে প্রশিক্ষিত কুকুর, তাপ শনাক্তকারী যন্ত্র এবং ভারী ধ্বংসাবশেষ সরানোর সরঞ্জাম কাজে লাগানো হচ্ছে। কংক্রিটের বড় টুকরা সরানোর সময় সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে, যাতে ভেতরে কেউ বেঁচে থাকলে তাঁর ওপর নতুন করে ধ্বংসাবশেষ না পড়ে।
ধসে পড়ার পর একাধিক মানুষকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। কয়েকজনকে জীবিত বের করে আনার ঘটনা উদ্ধারকর্মী ও স্বজনদের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে। তবে ধ্বংসস্তূপের গভীরে পৌঁছাতে সময় লাগছে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের প্রকৃত সংখ্যা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে, কারণ ভবনটিতে কর্মরত শ্রমিক, দোকানের কর্মচারী এবং আশপাশে থাকা মানুষের হিসাব আলাদাভাবে যাচাই করতে হচ্ছে।
নির্মাণ অনুমোদন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন
দুর্ঘটনার পর ভবনটির নির্মাণ অনুমোদন এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, ভবনটির নির্মাণকাজের প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছিল না। সেখানে দোকান পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবহার-সংক্রান্ত ছাড়পত্রও ছিল না বলে জানানো হয়েছে।
তবে ঠিক কী কারণে ভবনটি ধসে পড়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। নির্মাণের মান, কাঠামোগত নকশা, ব্যবহৃত উপকরণ এবং তদারকির ঘাটতি—সবকিছুই তদন্তের আওতায় আসতে পারে। চূড়ান্ত কারণ নির্ধারণের আগে কোনো একটি বিষয়কে দুর্ঘটনার জন্য দায়ী করা যাচ্ছে না।
ভবনটির মালিকানা ও দায়িত্ব বণ্টন নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্মাণের কাগজপত্র এবং নিরাপত্তা-সংক্রান্ত নথি পরীক্ষা করতে হবে। তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠতে পারে।
নাইরোবিতে ভবন নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ
কেনিয়ার দ্রুত নগরায়ণের ফলে নাইরোবিতে বহুতল ভবন নির্মাণ বেড়েছে। আবাসন ও ব্যবসার চাহিদা পূরণে নতুন স্থাপনা তৈরি হলেও নির্মাণের মান, অনুমোদন এবং নিয়মিত পরিদর্শন নিশ্চিত করা জরুরি। কোনো ভবনে ত্রুটি থাকলে তা শুধু নির্মাণশ্রমিকদের নয়, আশপাশের বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদেরও বিপদের মুখে ফেলে।
এই দুর্ঘটনা ভবন নির্মাণের নিয়ম কার্যকর করার বিষয়টি নতুন করে সামনে এনেছে। অনুমোদন ছাড়া নির্মাণ বন্ধ করা, কাজের প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং ভবন ব্যবহারের আগে যথাযথ ছাড়পত্র নিশ্চিত করার দাবি জোরালো হচ্ছে।
এখন উদ্ধার অভিযানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার কারণ নির্ধারণ এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নিখোঁজদের পরিবারগুলোর কাছে প্রতিটি মুহূর্ত এখন অনিশ্চয়তা ও অপেক্ষার।
