সুদান ও দক্ষিণ সুদানের মধ্যে বিতর্কিত সীমান্ত অঞ্চল আবেইয়ের একটি ব্যস্ত বাজারে ড্রোন হামলায় অন্তত ১৫৩ জন নিহত হয়েছেন। সোমবার, ১৯ অক্টোবর, আমিয়েত বাজার এলাকায় হামলার পর আগুন ছড়িয়ে পড়ে বাজারের বিভিন্ন অংশে। হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ঘটনাটি সুদানের চলমান গৃহযুদ্ধের ভয়াবহতা নতুন করে সামনে এনেছে এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
আবেই তেলসমৃদ্ধ একটি অঞ্চল, যার সার্বভৌমত্ব নিয়ে সুদান ও দক্ষিণ সুদানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ রয়েছে। অঞ্চলটি যৌথভাবে পরিচালিত হলেও এর ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান এখনো পুরোপুরি নির্ধারিত হয়নি। চলমান সংঘাতের মধ্যে এই এলাকায় হামলা দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ককেও আরও জটিল করে তুলতে পারে।
ব্যস্ত বাজারে হামলা, আগুনে পুড়েছে বহু স্থাপনা
আমিয়েত বাজার স্থানীয় মানুষের কেনাকাটা ও ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এখানে খাদ্যপণ্য, জ্বালানি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর বেচাকেনা হয়। হামলার সময় বাজারে বহু মানুষ উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে। ড্রোন আঘাত হানার পর একাধিক বিস্ফোরণ ঘটে এবং জ্বালানির মজুতস্থলে আগুন ছড়িয়ে পড়ে।
আগুন ও ধ্বংসাবশেষের কারণে উদ্ধারকাজ কঠিন হয়ে পড়ে। কিছু মরদেহ এতটাই পুড়ে গেছে যে সেগুলো শনাক্ত করাও কঠিন হয়েছে বলে স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। বহু মানুষ আহত হয়েছেন এবং আরও অনেকে নিখোঁজ রয়েছেন। আহতদের মধ্যে গুরুতর দগ্ধ ব্যক্তিও রয়েছেন, যাঁদের জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হয়েছে।
চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে আহতদের চাপ বেড়ে যায়। সীমিত চিকিৎসা সরঞ্জাম ও জনবলের মধ্যে গুরুতর রোগীদের সেবা দেওয়া বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন চিকিৎসা, অগ্নিনির্বাপণ ও জরুরি সাড়াদানকারী দল মোতায়েন করেছে।
হামলার দায় নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
দক্ষিণ সুদানের কর্মকর্তারা হামলার জন্য সুদানের সেনাবাহিনীকে দায়ী করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, ড্রোন দিয়ে বাজারের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করা হয়েছে। তবে হামলার লক্ষ্য ও হতাহতদের পরিচয় সম্পর্কে স্বাধীনভাবে সব তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে সুদানের সামরিক বাহিনীর এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, হামলার লক্ষ্য ছিল জ্বালানিবাহী ট্যাংকার, যেগুলো দক্ষিণ সুদান থেকে সুদানের আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) জন্য জ্বালানি নিয়ে যাচ্ছিল। তাঁর দাবি, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে আরএসএফের সদস্য ও জ্বালানি পাচারের সঙ্গে যুক্ত লোকজন ছিলেন। তবে এই বক্তব্যের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন যাচাই হয়নি।
এ ধরনের পরস্পরবিরোধী দাবি সংঘাতপূর্ণ এলাকায় তথ্য যাচাইয়ের জটিলতা তুলে ধরে। সামরিক পক্ষগুলো প্রায়ই নিজেদের অভিযানের উদ্দেশ্যকে নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করে ব্যাখ্যা করে, কিন্তু বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি হলে তার দায় ও প্রকৃত পরিস্থিতি নির্ধারণ জরুরি হয়ে ওঠে।
সুদানের গৃহযুদ্ধের ভয়াবহতা বাড়ছে
২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে সুদানের সেনাবাহিনী ও আরএসএফের মধ্যে যুদ্ধ চলছে। ক্ষমতা ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শুরু হওয়া এই সংঘাত দেশটির বিশাল অংশকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বহু মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন, খাদ্য ও চিকিৎসার সংকট তীব্র হয়েছে এবং বিভিন্ন এলাকায় ত্রাণ পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ড্রোন হামলা সংঘাতের অন্যতম ভয়াবহ দিক হয়ে উঠেছে। দূর থেকে পরিচালিত এসব অস্ত্র দ্রুত আঘাত হানতে পারে, কিন্তু জনবসতিপূর্ণ এলাকায় সামরিক লক্ষ্য ও বেসামরিক মানুষের মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ে। আবেইয়ের হামলা সেই ঝুঁকিরই বড় উদাহরণ।
সীমান্ত ও জ্বালানি নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
আবেইয়ের ভৌগোলিক অবস্থান অঞ্চলটিকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ করেছে। তেলসম্পদ, জ্বালানি পরিবহন এবং সীমান্তপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এখানে বহুদিন ধরেই উত্তেজনা রয়েছে। সুদানের যুদ্ধের প্রভাব দক্ষিণ সুদানের সীমান্তবর্তী এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ছে।
হামলার পর দক্ষিণ সুদান সুদানের রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে এবং বেসামরিক মানুষের জীবন ও সম্পদের ক্ষতি হয় এমন কর্মকাণ্ড বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসংঘও হামলার নিন্দা করেছে। তবে কূটনৈতিক প্রতিবাদ সংঘাত থামাতে কতটা কার্যকর হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
বেসামরিক মানুষের সুরক্ষাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন
হামলার পর বহু পরিবার প্রিয়জনের খোঁজে উদ্বিগ্ন অবস্থায় রয়েছে। নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করা, আহতদের চিকিৎসা এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান এখন জরুরি কাজ। একই সঙ্গে ঘটনার স্বাধীন তদন্ত এবং দায় নির্ধারণের প্রয়োজন রয়েছে।
আবেইয়ের এই রক্তক্ষয়ী হামলা দেখিয়ে দিয়েছে, সুদানের গৃহযুদ্ধের প্রভাব আর শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বাজার, জ্বালানি কেন্দ্র ও সাধারণ মানুষের জীবনও ক্রমেই সংঘাতের লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠছে। কার্যকর যুদ্ধবিরতি এবং বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে এ ধরনের বিপর্যয় আরও ঘটতে পারে।
