একদিকে রান্নাঘরের গাছপালায় পানি দিচ্ছে রোবট, অন্যদিকে টেবিল পরিষ্কার করে বাসন তুলছে। কোথাও আবার কারখানার পাম্প খুলে মূল্যবান যন্ত্রাংশ আলাদা করছে, আবার কোথাও মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে পণ্য সরানো ও সাজানোর কাজ দেখাচ্ছে। কল্পবিজ্ঞানের দৃশ্য মনে হলেও ইউরোপে এখন এসব প্রযুক্তি পরীক্ষাগারের বাইরে বাস্তব প্রদর্শনীতে চলে এসেছে।
সেপ্টেম্বরের শুরুতে ব্রাসেলসে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে অনুষ্ঠিত এক বিশেষ প্রদর্শনীতে ইউরোপের গবেষকেরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর রোবটের এমনই বহুমুখী সক্ষমতা দেখিয়েছেন। একই সময়ে বার্লিনের আইএফএ প্রযুক্তি মেলাতেও মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহারযোগ্য রোবটের একের পর এক প্রদর্শনী হয়েছে। ইউরোপের লক্ষ্য এখন শুধু রোবট বানানো নয়—এমন যন্ত্র তৈরি করা, যা চারপাশ বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী কাজ বদলাতে পারবে।
ঘরের কাজ থেকে শুরু
ব্রাসেলসের প্রদর্শনীতে জার্মান মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রের রোবট ‘রোলিন জাস্টিন’ একটি সাধারণ ঘরোয়া কাজ করে দেখিয়েছে—গাছের টবে পানি দেওয়া। কাজটি দেখতে খুব সহজ হলেও এর পেছনে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি। রোবটকে শুধু একটি নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে পানি ঢালতে বলা নয়; তাকে পরিবেশ বুঝে অবস্থান নিতে, বস্তু শনাক্ত করতে এবং প্রয়োজনীয় গতিবিধি সম্পন্ন করতে হয়।
আরও চমক দেখা গেছে চারটি ভিন্ন রোবটকে একসঙ্গে একটি টেবিল পরিষ্কার করার কাজে। তারা আলাদাভাবে কাজ করার পাশাপাশি একে অপরের গতিবিধির সঙ্গে সমন্বয় করেছে। কেউ টেবিল থেকে কমলার রস ও দুধ সরিয়েছে, কেউ খালি প্যাকেট ফেলে দিয়েছে, আবার কেউ বাসন তুলেছে। পুরো কাজটি শেষ করতে তাদের সময় লেগেছে প্রায় ১০ মিনিট।
এই পরীক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—রোবটগুলোকে প্রতিটি ছোট কাজের জন্য আলাদা করে নির্দিষ্ট নির্দেশ দেওয়ার বদলে পরিস্থিতি বুঝে কাজ করার সক্ষমতা দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ ভবিষ্যতের রোবট শুধু ‘একটি কাজের যন্ত্র’ হবে না; একই পরিবেশে একাধিক কাজ করতে পারবে।
কারখানায় আরও বড় ভূমিকা
ঘরের কাজের পাশাপাশি ইউরোপীয় গবেষকেরা শিল্পক্ষেত্রেও রোবটের সক্ষমতা পরীক্ষা করছেন। জার্মানির ফ্রাউনহোফার ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রদর্শনীতে পুরোনো পানির পাম্প স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে তার বিভিন্ন অংশ আলাদা করার প্রযুক্তি দেখিয়েছেন।
এর পেছনে রয়েছে পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের ধারণা। পুরোনো যন্ত্র থেকে মূল্যবান ধাতু বা পুনর্ব্যবহারযোগ্য অংশ মানুষের হাতে আলাদা করার বদলে রোবট কাজটি করতে পারলে সময় ও শ্রম দুটোই কমতে পারে। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ বা একঘেয়ে কাজেও মানুষের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব।
বার্লিনের আইএফএ মেলাতেও শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহারের উপযোগী রোবটের দিকে বিশেষ নজর ছিল। কিছু নির্মাতা পণ্য পরিবহন, বাছাই ও গুদাম ব্যবস্থাপনার মতো কাজে রোবটের ব্যবহার দেখিয়েছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, রোবট প্রযুক্তির পরবর্তী ধাপ শুধু কারখানার নির্দিষ্ট লাইনে কাজ করা নয়; বরং পরিবর্তনশীল পরিবেশে নানা ধরনের কাজ সামলানো।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই বদলে দিচ্ছে রোবটকে
এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। পুরোনো প্রজন্মের রোবট সাধারণত নির্দিষ্ট ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজের জন্য প্রোগ্রাম করা হতো। নতুন প্রজন্মের রোবটের ক্ষেত্রে লক্ষ্য হচ্ছে চারপাশের পরিবেশ দেখে বস্তু শনাক্ত করা, পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা।
ইউরোপীয় গবেষণা নেটওয়ার্ক ইউরোবিনের কাজের অন্যতম লক্ষ্যও হলো বিভিন্ন ধরনের রোবটকে ভবিষ্যতে একসঙ্গে কাজ করতে সক্ষম করা। এর ফলে একটি রোবট যে কাজটি ভালোভাবে করতে পারে, সেটি সে করবে; অন্য কাজ অন্য রোবটের কাছে চলে যাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপের বয়স্ক জনসংখ্যা এবং শ্রমবাজারে দক্ষ কর্মীর ঘাটতি এই প্রযুক্তির চাহিদা আরও বাড়াতে পারে। মানুষের পরিবর্তে সব কাজ রোবট করবে—এমন ধারণা এখনই বাস্তব নয়। কিন্তু ভারী, ঝুঁকিপূর্ণ কিংবা বারবার করতে হয় এমন কাজ থেকে মানুষকে সরিয়ে রোবটকে যুক্ত করা ক্রমেই বাস্তবসম্মত হয়ে উঠছে।
অটোমোবাইল শিল্পের মতো বড় হতে পারে রোবট খাত
ইউরোপীয় মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীদের মতে, আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর রোবট ইউরোপের জন্য অটোমোবাইল শিল্পের সমপর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ একটি শিল্পখাতে পরিণত হতে পারে। এই সম্ভাবনা থেকেই ইউরোপ রোবট গবেষণাকে শুধু বৈজ্ঞানিক প্রকল্প হিসেবে নয়, কৌশলগত শিল্পনীতি হিসেবেও দেখছে।
তবে সামনে বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। রোবটকে বাস্তব পরিবেশে নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করানো, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ব্যয় কমানো এবং মানুষের সঙ্গে নিরাপদে কাজ করার সক্ষমতা তৈরি করা এখনও সহজ নয়।
তবু ব্রাসেলস ও বার্লিনের সাম্প্রতিক প্রদর্শনী একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—রোবট এখন আর শুধু কারখানার নির্দিষ্ট যন্ত্র নয়। ঘরের কাজ থেকে শুরু করে শিল্প উৎপাদন, পুনর্ব্যবহার, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং মানুষের সহায়তা—বহু ক্ষেত্রে একই ধরনের বুদ্ধিমান যন্ত্র ব্যবহারের দিকে এগোচ্ছে ইউরোপ।
