মহাকাশ থেকে পৃথিবীতে পৌঁছানো এমন এক সংকেত শনাক্ত করেছেন বিজ্ঞানীরা, যা এতটাই ক্ষীণ যে সেটি ধরতে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রেডিও টেলিস্কোপগুলোর একটি ব্যবহার করতে হয়েছে। সংকেতটি এসেছে বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরের নিরপেক্ষ হাইড্রোজেন থেকে। সরাসরি কোনো একটি গ্যালাক্সির ছবি না তুলে মহাবিশ্বের বিশাল অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা হাইড্রোজেনের সম্মিলিত রেডিও আভা শনাক্ত করেই এই সাফল্য পেয়েছেন গবেষকেরা।
দক্ষিণ আফ্রিকার মিরক্যাট রেডিও টেলিস্কোপ ব্যবহার করে করা এই পর্যবেক্ষণ মহাবিশ্বের বিশাল কাঠামোকে নতুনভাবে মানচিত্রে আনার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞদের কাছে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ কারণ মহাবিশ্বের দৃশ্যমান অংশের অনেক কিছুই আমরা গ্যালাক্সি ও নক্ষত্রের আলো দিয়ে দেখি, কিন্তু সাধারণ পদার্থের একটি বড় অংশ এমন হাইড্রোজেন গ্যাসে ছড়িয়ে আছে, যা সরাসরি দেখা অত্যন্ত কঠিন।
কী ধরা পড়ল টেলিস্কোপে
গবেষকেরা যে সংকেত শনাক্ত করেছেন, সেটি নিরপেক্ষ হাইড্রোজেন পরমাণু থেকে আসা রেডিও বিকিরণ। এই সংকেতকে সাধারণত ২১ সেন্টিমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের হাইড্রোজেন রেখা হিসেবে শনাক্ত করা হয়।
সমস্যা হলো, এত দূর থেকে আসা সংকেত অত্যন্ত দুর্বল। পৃথিবীর আশপাশের রেডিও উৎস, কৃত্রিম সংকেত এবং টেলিস্কোপের নিজস্ব যন্ত্রগত শব্দের তুলনায় মহাজাগতিক সংকেত অনেক সময় এতটাই ক্ষীণ হয় যে সেটিকে আলাদা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
মিরক্যাটের মতো বিশাল রেডিও টেলিস্কোপের একাধিক অ্যান্টেনা থেকে পাওয়া তথ্য একত্র করে গবেষকেরা সেই ক্ষীণ আভা শনাক্ত করেছেন। এর ফলে বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো দেখাতে পেরেছেন যে বিশাল মহাজাগতিক অঞ্চলের সম্মিলিত হাইড্রোজেন সংকেত ব্যবহার করে মহাবিশ্বের পদার্থের বণ্টন সম্পর্কে তথ্য পাওয়া সম্ভব।
গ্যালাক্সি গুনে নয়, হাইড্রোজেনের আভায় মহাবিশ্বের মানচিত্র
মহাবিশ্বের মানচিত্র তৈরির প্রচলিত পদ্ধতিতে বিজ্ঞানীরা গ্যালাক্সি শনাক্ত করেন এবং তাদের অবস্থান, দূরত্ব ও গতিবিধি বিশ্লেষণ করেন। কিন্তু এই পদ্ধতিতে খুব ক্ষীণ কিংবা দূরবর্তী গ্যালাক্সি বাদ পড়ে যেতে পারে।
নতুন পদ্ধতিতে বিজ্ঞানীরা আলাদা আলাদা গ্যালাক্সি শনাক্ত করার বদলে বিশাল অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা হাইড্রোজেনের সম্মিলিত সংকেত পরিমাপ করেন। এতে একসঙ্গে অনেক বড় মহাজাগতিক এলাকার পদার্থের বণ্টন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব।
এই পদ্ধতি সফল হলে ভবিষ্যতে মহাবিশ্বের ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরির কাজ অনেক দ্রুত হতে পারে। বিশেষ করে মহাবিশ্বের বিভিন্ন সময়ে পদার্থ কীভাবে জমাট বেঁধে গ্যালাক্সি, গ্যালাক্সি গুচ্ছ এবং আরও বড় কাঠামো তৈরি করেছে, তা বোঝার ক্ষেত্রে এটি নতুন হাতিয়ার হতে পারে।
অন্ধকার শক্তি ও মহাবিশ্বের প্রসারণের রহস্য
এই গবেষণার গুরুত্ব শুধু হাইড্রোজেন শনাক্ত করাতেই সীমাবদ্ধ নয়। মহাবিশ্বের বিশাল কাঠামো কীভাবে তৈরি হয়েছে এবং সময়ের সঙ্গে তা কীভাবে বদলেছে, সেটি বোঝা আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের অন্যতম বড় প্রশ্ন।
এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অন্ধকার শক্তি নামের রহস্যময় উপাদান। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, মহাবিশ্বের প্রসারণ ত্বরান্বিত হওয়ার পেছনে অন্ধকার শক্তির ভূমিকা থাকতে পারে। মহাবিশ্বের বিভিন্ন সময়ে সাধারণ পদার্থের অবস্থান ও বণ্টনের নির্ভুল মানচিত্র তৈরি করতে পারলে এই প্রসারণের ইতিহাস আরও ভালোভাবে পরীক্ষা করা সম্ভব হবে।
এ কারণেই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৃহৎ মহাজাগতিক মানচিত্র তৈরির উদ্যোগ দ্রুত বেড়েছে। ডার্ক এনার্জি স্পেকট্রোস্কোপিক ইনস্ট্রুমেন্ট বা ডেসির মাধ্যমে ইতোমধ্যে আকাশের প্রায় ৭৫ শতাংশ জুড়ে বিশাল ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি হয়েছে, যেখানে প্রায় ৪০০ কোটি মহাজাগতিক বস্তুর তথ্য রয়েছে।
এখনও রহস্যের বড় অংশ অমীমাংসিত
নতুন সংকেত শনাক্ত হওয়া নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হলেও বিজ্ঞানীরা এটিকে মহাবিশ্বের সব রহস্যের সমাধান হিসেবে দেখছেন না। বরং এটি আরও বড় পর্যবেক্ষণের সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
বিশেষ করে ভবিষ্যতের আরও শক্তিশালী রেডিও টেলিস্কোপ ব্যবহার করে যদি একই পদ্ধতিতে আরও দূরের এবং আরও বিস্তৃত অঞ্চলের হাইড্রোজেন সংকেত শনাক্ত করা যায়, তাহলে মহাবিশ্বের বিবর্তনের একটি নতুন ছবি তৈরি হতে পারে।
এর পাশাপাশি দ্রুত রেডিও বিস্ফোরণ বা এফআরবির মতো মহাজাগতিক সংকেতও বিজ্ঞানীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিলিয়ন আলোকবর্ষ পাড়ি দিয়ে আসা এসব ক্ষণস্থায়ী রেডিও বিস্ফোরণ মহাবিশ্বের পথে থাকা সাধারণ পদার্থ সম্পর্কে তথ্য বহন করতে পারে।
সব মিলিয়ে সাম্প্রতিক এই পর্যবেক্ষণ একটি নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলেছে। মহাবিশ্বকে শুধু চোখে দেখা আলো দিয়ে নয়, অদৃশ্য ও অত্যন্ত ক্ষীণ রেডিও সংকেতের মাধ্যমেও পড়া সম্ভব হচ্ছে। আর সেই সংকেতের ভেতরেই হয়তো লুকিয়ে আছে মহাবিশ্বের জন্ম, গঠন ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আরও বড় কিছু উত্তর।
