কসোভোর সাবেক প্রেসিডেন্ট হাশিম থাচিকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে ২৫ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে হেগের কসোভো স্পেশালিস্ট চেম্বার্স। ১৯৯৮-৯৯ সালের কসোভো যুদ্ধের সময় কসোভো লিবারেশন আর্মির শীর্ষ নেতা হিসেবে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন ও বেআইনি আটকসহ কয়েকটি অপরাধে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
থাচির পাশাপাশি কসোভো লিবারেশন আর্মির আরও তিন সাবেক শীর্ষ নেতাকেও বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে। তবে রায় এখনো চূড়ান্ত নয়; আসামিদের আপিলের সুযোগ রয়েছে।
কী অভিযোগ ছিল থাচির বিরুদ্ধে
হাশিম থাচি কসোভো যুদ্ধের সময় কসোভো লিবারেশন আর্মির অন্যতম শীর্ষ নেতা ছিলেন। পরে তিনি কসোভোর রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন।
হেগের আদালতে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় প্রতিপক্ষ, রাজনৈতিক বিরোধী এবং সার্বীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সহযোগী হিসেবে বিবেচিত ব্যক্তিদের আটক, নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগ আনা হয়।
আদালত চারটি যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করেছে—অবৈধ বা নির্বিচারে আটক, নিষ্ঠুর আচরণ, নির্যাতন এবং হত্যা।
আদালতের অনুসন্ধান
কসোভো স্পেশালিস্ট চেম্বার্সের বিচারকরা জানিয়েছেন, মামলার প্রমাণে অন্তত ৩৮৫ জনকে বেআইনিভাবে আটক ও বন্দি করার ঘটনা উঠে এসেছে। অন্তত ৩০৩ জন নির্যাতনের শিকার হন এবং ৯৬ জন নিহত হন বলে আদালতের রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে থাচি ও অন্য আসামিরা নিজেদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
আদালত একই সঙ্গে ছয়টি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তাদের খালাস দিয়েছে। বিচারকদের মতে, এসব অভিযোগে প্রয়োজনীয় প্রমাণের মান পূরণ হয়নি।
অর্থাৎ পুরো মামলায় প্রসিকিউশনের সব অভিযোগ আদালত গ্রহণ করেনি; নির্দিষ্ট কয়েকটি যুদ্ধাপরাধের ক্ষেত্রেই দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
অন্য তিন নেতার সাজা
থাচির সঙ্গে সাবেক কসোভো লিবারেশন আর্মির নেতা কাদরি ভেসেলি, রেক্সহেপ সেলিমি ও ইয়াকুপ ক্রাসনিকিও বিচারের মুখোমুখি হন।
ক্রাসনিকিকে ২৫ বছর, ভেসেলিকে ১৮ বছর এবং সেলিমিকে ১৩ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাদের হেফাজতে কাটানো সময় সাজা থেকে সমন্বয় করার বিষয়টিও রায়ে রয়েছে।
চার আসামিই আপিল করতে পারবেন।
কসোভোতে প্রতিক্রিয়া
রায়ের পর কসোভোতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। থাচির সমর্থকেরা রায়ের প্রতিবাদ করেছেন এবং আদালতের বাইরে বিক্ষোভও হয়েছে।
কসোভোর অনেক মানুষের কাছে থাচি স্বাধীনতা আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ নেতা। অন্যদিকে যুদ্ধের সময় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো আদালতের রায়কে দীর্ঘদিনের বিচারপ্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ফল হিসেবে দেখেছে।
সার্বিয়ার পক্ষ থেকেও রায় নিয়ে প্রতিক্রিয়া এসেছে। বেলগ্রেডের কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে কসোভো যুদ্ধের সময় সার্ব ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের বিচার দাবি করে আসছেন।
কেন রায়টি গুরুত্বপূর্ণ
কসোভো যুদ্ধ ইউরোপের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম রক্তক্ষয়ী সংঘাত। যুদ্ধের পর কসোভো স্বাধীনতা ঘোষণা করলেও সার্বিয়া এখনো সেই স্বাধীনতা স্বীকার করে না।
এই মামলার মাধ্যমে কসোভো লিবারেশন আর্মির সাবেক শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধকালীন ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণের চেষ্টা হয়েছে। আদালত স্পষ্ট করেছে, কসোভোর স্বাধীনতার রাজনৈতিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন নয়, বরং নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের অপরাধমূলক দায়ই মামলার বিষয় ছিল।
রায়টি তাই শুধু একজন সাবেক প্রেসিডেন্টের সাজা নয়; বরং কসোভো যুদ্ধের ইতিহাস, যুদ্ধাপরাধের বিচার এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যক্তিগত দায় নিয়ে দীর্ঘ আন্তর্জাতিক বিচারপ্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
