ইউক্রেন যুদ্ধের উত্তাপ এবার আরও গভীরভাবে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে ইউরোপের পূর্ব সীমান্তে। লিথুয়ানিয়ার আকাশসীমায় প্রবেশ করা একটি ড্রোনকে ন্যাটোর মিশনে থাকা ইতালীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার পর বাল্টিক অঞ্চলে নতুন করে নিরাপত্তা উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। প্রাথমিকভাবে ড্রোনটিকে রুশ ব্যবহৃত একটি মডেল হিসেবে শনাক্ত করা হলেও সেটি ইচ্ছাকৃতভাবে লিথুয়ানিয়াকে লক্ষ্য করেছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ইউরোপের পূর্বাঞ্চলীয় দেশগুলো আকাশসীমা ও সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।
কী ঘটেছিল লিথুয়ানিয়ার আকাশে
লিথুয়ানিয়ার জাতীয় সংকট ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার একটি ড্রোন দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশ করে। পরে ন্যাটোর বাল্টিক এয়ার পুলিশিং মিশনে থাকা একটি ইতালীয় যুদ্ধবিমান সেটিকে শনাক্ত করে এবং গুলি করে ভূপাতিত করে।
ড্রোনটি লিথুয়ানিয়ার মধ্যাঞ্চলের প্রাটকুনাই এলাকার কাছে বিধ্বস্ত হয়। এলাকাটি দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর কাউনাসের কাছাকাছি। এর আগে রাজধানী ভিলনিয়াসসহ কয়েকটি অঞ্চলে সতর্কতা জারি করা হয়েছিল।
লিথুয়ানিয়ার প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ধ্বংসাবশেষের মধ্যে বিস্ফোরক বহনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। ফলে এটি কেবল একটি সাধারণ নজরদারি ড্রোন ছিল না বলেই প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
রাশিয়ার তৈরি, কিন্তু লক্ষ্য কি লিথুয়ানিয়া?
ঘটনার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে ড্রোনটির উৎস ও উদ্দেশ্য নিয়ে। লিথুয়ানিয়ার প্রেসিডেন্ট গিতানাস নাউসেদা বলেছেন, ড্রোনটি রাশিয়ায় ব্যবহৃত গেরবেরা ধরনের বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে তিনি একই সঙ্গে ইঙ্গিত দিয়েছেন, ড্রোনটির মূল লক্ষ্য সম্ভবত লিথুয়ানিয়া ছিল না। সেটি ইউক্রেনের দিকে যাওয়ার সময় ইলেকট্রনিক যুদ্ধের প্রভাবে পথ পরিবর্তন করে লিথুয়ানিয়ার আকাশসীমায় ঢুকে পড়তে পারে।
এই ব্যাখ্যা সত্য হলে ঘটনাটি রাশিয়ার সরাসরি লিথুয়ানিয়া আক্রমণের প্রমাণ নয়। কিন্তু একই সঙ্গে এটি দেখিয়ে দেয়, ইউক্রেনের যুদ্ধ কীভাবে প্রতিবেশী ন্যাটো দেশগুলোর আকাশসীমায় অনিচ্ছাকৃতভাবেও ঝুঁকি তৈরি করছে।
ন্যাটোর জন্য কেন ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ
লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া ও এস্তোনিয়া ২০০৪ সালে ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই বাল্টিক আকাশসীমার নিরাপত্তায় জোটের বিশেষ নজর রয়েছে। ন্যাটোর বিমানগুলো নিয়মিত সেখানে টহল দেয় এবং সন্দেহজনক উড়োজাহাজ বা ড্রোন শনাক্ত হলে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানায়।
এর আগে এস্তোনিয়া ও লাটভিয়ার আকাশসীমাতেও ড্রোন নিয়ে একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। ফলে লিথুয়ানিয়ার ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে না।
ইউক্রেন যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই রাশিয়া ও ন্যাটোর সরাসরি সংঘর্ষ এড়িয়ে চলার পাশাপাশি সীমান্তবর্তী দেশগুলোর আকাশসীমা নিরাপদ রাখার চ্যালেঞ্জ বাড়ছে।
ইউরোপে বাড়ছে সতর্কতা
ঘটনার পর ইউরোপীয় নেতাদের মধ্যে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। কারণ একটি সামরিক ড্রোন ন্যাটোর আকাশসীমায় ঢুকে পড়া মানেই সরাসরি হামলা নয়, কিন্তু এর ফলে ভুল হিসাব বা দ্রুত সামরিক প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে ড্রোনটির মধ্যে বিস্ফোরক থাকলে সেটি ইউক্রেনের দিকে যাওয়ার সময় পথ হারিয়েছে—এমন ব্যাখ্যাও পুরো ঝুঁকি দূর করে না। কারণ কয়েক মিনিটের ভুল পথও একটি সার্বভৌম দেশের ভূখণ্ডে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে।
লিথুয়ানিয়ার কর্মকর্তারা তাই আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিচ্ছেন।
ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত ইচ্ছাকৃত অনুপ্রবেশ, নাকি যুদ্ধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া—তা তদন্তেই স্পষ্ট হবে। তবে একটি বিষয় ইতিমধ্যে পরিষ্কার: ইউক্রেন যুদ্ধের ভৌগোলিক সীমা কাগজে যতই নির্দিষ্ট থাকুক, আকাশপথে এর ঝুঁকি এখন ন্যাটোর পূর্ব সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।
