প্রশান্ত মহাসাগরের ছোট ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলোকে ঘিরে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের প্রতিযোগিতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। নিরাপত্তা, জলবায়ু, অবকাঠামো, শ্রমবাজার ও কূটনৈতিক অংশীদারিত্ব—প্রতিটি ক্ষেত্রেই দুই দেশ নিজেদের প্রভাব বাড়াতে চাইছে। আর এর পেছনে রয়েছে আরও বড় বাস্তবতা: প্রশান্ত মহাসাগরে চীনের দ্রুত বাড়তে থাকা উপস্থিতি।
সাম্প্রতিক প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ ফোরামের বৈঠক এই প্রতিযোগিতার চিত্র আরও স্পষ্ট করেছে। পালাউয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে চীনের ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা, তাইওয়ানের অংশগ্রহণ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে সদস্যদের মধ্যে মতপার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছে। একই সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড নিজেদের ঐতিহ্যগত ভূমিকা আরও শক্ত করার চেষ্টা করেছে।
অস্ট্রেলিয়া বহু বছর ধরেই প্রশান্ত অঞ্চলে সবচেয়ে বড় সাহায্যদাতা দেশগুলোর একটি। অবকাঠামো, বাজেট সহায়তা, জলবায়ু কর্মসূচি ও নিরাপত্তা সহযোগিতায় দেশটির বড় উপস্থিতি রয়েছে। কিন্তু ২০২৬ সালের লওয়ি ইনস্টিটিউটের জরিপে দেখা গেছে, প্রশান্ত দ্বীপপুঞ্জে সবচেয়ে বেশি প্রভাবশালী দেশ হিসেবে অস্ট্রেলিয়াকে মনে করেন ৩৩ শতাংশ উত্তরদাতা, যেখানে চীনকে বলেছেন ৩৯ শতাংশ। এক বছর আগের তুলনায় এটি অস্ট্রেলিয়ার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত।
অস্ট্রেলিয়া অবশ্য বসে নেই। গত এক বছরে ফিজি, পাপুয়া নিউগিনি, ভানুয়াতু ও সলোমন দ্বীপপুঞ্জের সঙ্গে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়িয়েছে। জুলাইয়ে ফিজির সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার নতুন প্রতিরক্ষা জোট বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। চীন সেই চুক্তি নিয়ে প্রকাশ্য সতর্কতাও জানিয়েছে।
নিউজিল্যান্ডও নতুন করে সক্রিয় হচ্ছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে দেশটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ ফোরামের ট্রয়কায় যোগ দিয়েছে এবং ২০২৭ সালে ফোরামের বৈঠক আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লাক্সন বলেছেন, ফোরামের ট্রয়কায় যোগ দেওয়ার মাধ্যমে এক দশকেরও বেশি সময় পর নিউজিল্যান্ড আবার আঞ্চলিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে এসেছে।
নিউজিল্যান্ডের শক্তি অবশ্য অস্ট্রেলিয়ার মতো সামরিক নয়। শিক্ষা, শ্রম চলাচল, স্বাস্থ্য, উন্নয়ন সহযোগিতা ও দীর্ঘদিনের সামাজিক-সাংস্কৃতিক সম্পর্কের মাধ্যমে দেশটি প্রশান্ত দ্বীপপুঞ্জে প্রভাব ধরে রেখেছে। পাপুয়া নিউগিনির সঙ্গে সাম্প্রতিক আলোচনায় শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, শ্রম চলাচল, বিমান যোগাযোগ ও আঞ্চলিক উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু দুই দেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ চীন।
চীন গত এক দশকে প্রশান্ত মহাসাগরে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা উপস্থিতি বাড়িয়েছে। অবকাঠামো, বাণিজ্য, উন্নয়ন সহায়তা, পুলিশ সহযোগিতা এবং রাজনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যমে বেইজিং দ্বীপদেশগুলোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক তৈরি করছে। এশিয়া-প্যাসিফিক কৌশল বিশ্লেষকদের মতে, চীনের লক্ষ্য কেবল অর্থনৈতিক সম্পর্ক নয়; বরং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে তার উপস্থিতি ও প্রভাবকে আঞ্চলিক বাস্তবতার স্বাভাবিক অংশ হিসেবে দেখা হবে।
সম্প্রতি চীনের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে। প্রশান্ত অঞ্চলের দেশগুলোর একটি অংশ এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও সবাই চীনের সমালোচনায় একমত হয়নি। নাউরু ও কিরিবাতির অবস্থান বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। ফলে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলো নিজেরাই এখন বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে।
এই দেশগুলোর কৌশলও বেশ বাস্তববাদী। তারা অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের নিরাপত্তা সহযোগিতা নিতে চায়, আবার চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কও রাখতে চায়। অর্থাৎ অধিকাংশ দ্বীপরাষ্ট্র কোনো একটি শক্তির পক্ষে পুরোপুরি অবস্থান না নিয়ে একাধিক অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার নীতি অনুসরণ করছে।
তাই অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের প্রতিযোগিতা আসলে শুধু কে বেশি প্রভাবশালী হবে—সেই প্রশ্ন নয়। বরং প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলো তাদের ভবিষ্যৎ কীভাবে নির্ধারণ করবে, সেই প্রশ্নও এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।
অস্ট্রেলিয়া সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তিতে এগিয়ে, নিউজিল্যান্ড ঐতিহাসিক ও সামাজিক সম্পর্কের জায়গায় শক্তিশালী। আর চীন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব দ্রুত বাড়াচ্ছে।
ফলে প্রশান্ত মহাসাগর এখন আর দূরবর্তী দ্বীপগুলোর শান্ত অঞ্চল নয়—এটি ধীরে ধীরে ইন্দো-প্যাসিফিক শক্তির প্রতিযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে পরিণত হচ্ছে।
