আজ থেকে ঠিক বিশ বছর আগে কুমিরের একটি স্টিংরের আঘাতে থেমে গিয়েছিল অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তী বন্যপ্রাণীপ্রেমীর জীবন। কিন্তু স্টিভ আরউইনের মৃত্যু তাঁর গল্পের শেষ হয়ে ওঠেনি। বরং মৃত্যুর দুই দশক পরও ‘Crocodile Hunter’ নামে পরিচিত এই অস্ট্রেলীয় সংরক্ষণবাদীর নাম বন্যপ্রাণী রক্ষার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
২০০৬ সালের ৪ সেপ্টেম্বর উত্তর কুইন্সল্যান্ডের ব্যারিয়ার রিফের কাছে একটি তথ্যচিত্রের শুটিং করছিলেন স্টিভ আরউইন। সমুদ্রের পানিতে স্টিংরে নিয়ে কাজ করার সময় প্রাণীটির লেজের কাঁটা তাঁর বুকে আঘাত করে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধারের চেষ্টা করা হলেও শেষ পর্যন্ত মাত্র ৪৪ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। ঘটনাটি সে সময় বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
আরউইনের জনপ্রিয়তা তৈরি হয়েছিল বন্যপ্রাণীর প্রতি তাঁর অসাধারণ সাহস ও আবেগের কারণে। টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘The Crocodile Hunter’-এ তাঁকে কখনো কুমিরের সামনে, কখনো সাপের পাশে, আবার কখনো বিপজ্জনক বন্যপ্রাণীর খুব কাছাকাছি দেখা যেত। তাঁর উচ্চস্বরে উচ্ছ্বাস, প্রাণীদের প্রতি ভালোবাসা এবং দর্শকদের শিক্ষিত করার চেষ্টা তাঁকে সাধারণ উপস্থাপকের চেয়ে অনেক বড় একটি সাংস্কৃতিক চরিত্রে পরিণত করেছিল।
তবে তাঁর পরিচয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সংরক্ষণবাদী হিসেবে ভূমিকা। স্টিভ আরউইন শুধু বিপজ্জনক প্রাণীর সঙ্গে লড়াই করে দর্শক টানতে চাননি; বরং তিনি মানুষের মধ্যে বন্যপ্রাণী নিয়ে ভয় কমিয়ে তাদের রক্ষার প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে চেয়েছিলেন। তাঁর পরিবার ও সহকর্মীরা পরবর্তী দুই দশকে সেই কাজ চালিয়ে গেছেন।
মৃত্যুর ২০ বছর পূর্তিতে তাঁর সন্তান বিন্ডি ও রবার্ট আরউইনও বাবাকে স্মরণ করেছেন। তাঁদের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডে স্পষ্ট, স্টিভের উত্তরাধিকার এখন কেবল পুরোনো টেলিভিশন অনুষ্ঠানের স্মৃতি নয়। পরিবারটি অস্ট্রেলিয়া জু ও Wildlife Warriors-এর মাধ্যমে সংরক্ষণকাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
স্টিভের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ওয়েস ম্যানিয়নও স্মরণ করেছেন সেই সময়কে, যখন তাঁরা একসঙ্গে কুমির উদ্ধার ও বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনার ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতেন। তাঁদের অনেক অভিযানে বিপদ ছিল, কিন্তু আরউইনের কাছে ঝুঁকির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ছিল প্রাণীদের জন্য কাজ করা।
আরউইনের মৃত্যুর ঘটনাটি যেমন আকস্মিক ছিল, তেমনি তাঁর জনপ্রিয়তার ব্যাপ্তিও ছিল অসাধারণ। অস্ট্রেলিয়ায় তাঁর স্মরণে প্রতিবছর নানা আয়োজন হয়। তাঁর পরিবারও বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে—স্টিভের প্রকৃত উত্তরাধিকার তাঁর টেলিভিশন খ্যাতি নয়, বরং মানুষকে বন্যপ্রাণীর প্রতি দায়িত্বশীল করে তোলার চেষ্টা।
বিশ বছর পর তাঁর মৃত্যুর দিকে ফিরে তাকালে একটি বিষয় বিশেষভাবে চোখে পড়ে। স্টিভ আরউইন হয়তো আর ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে ‘Crikey!’ বলে দর্শকদের চমকে দেন না, কিন্তু তাঁর তৈরি করা সংরক্ষণ-বার্তা এখনও নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছাচ্ছে।
একজন টেলিভিশন তারকা হিসেবে তিনি বিশ্বজুড়ে পরিচিত হয়েছিলেন, কিন্তু একজন সংরক্ষণবাদী হিসেবে তাঁর প্রভাব আরও দীর্ঘস্থায়ী হয়ে উঠেছে। তাই ২০ বছর পরও স্টিভ আরউইনকে স্মরণ করার অর্থ শুধু একটি মর্মান্তিক মৃত্যুকে স্মরণ করা নয়—বরং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্য তাঁর তৈরি করা এক বৈশ্বিক আবেগকে নতুন করে সামনে আনা।
