ইউক্রেন যুদ্ধের সাড়ে চার বছরের বেশি সময় পেরিয়ে রাশিয়ায় শুরু হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সংসদ নির্বাচন। শুক্রবার থেকে দেশটির ৪৫০ আসনের স্টেট ডুমা নির্বাচনে ভোট দিচ্ছেন ভোটাররা। তিন দিনব্যাপী এই ভোট চলবে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।
এটি ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ফলে শুধু নতুন আইনপ্রণেতা নির্বাচনের জন্য নয়, যুদ্ধ, অর্থনীতি ও দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে রুশ জনগণের মনোভাব বোঝার ক্ষেত্রেও এবারের নির্বাচনকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
রাশিয়ার সুদূর পূর্বাঞ্চলের কামচাটকা ও চুকোটকা অঞ্চল থেকে প্রথম ভোটগ্রহণ শুরু হয়। এরপর দেশটির বিভিন্ন সময় অঞ্চলে পর্যায়ক্রমে ভোটগ্রহণ শুরু হয়।
৪৫০ আসনের লড়াই
স্টেট ডুমার মোট আসন ৪৫০টি। নির্বাচনের মাধ্যমে নিম্নকক্ষের নতুন সদস্যরা দায়িত্ব নেবেন।
ক্ষমতাসীন ইউনাইটেড রাশিয়া পার্টির পাশাপাশি কমিউনিস্ট পার্টি, এলডিপিআর, এ জাস্ট রাশিয়া ও নিউ পিপলসসহ কয়েকটি দল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে।
তবে এবারের নির্বাচনে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশ্ন রয়েছে। রাশিয়ার সবচেয়ে পরিচিত উদারপন্থী ও যুদ্ধবিরোধী দল ইয়াবলোকোকে নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়ার সুযোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দলটি আপত্তি জানিয়েছে।
ফলে যুদ্ধবিরোধী রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে ভোটারদের পছন্দ সীমিত হয়ে পড়েছে বলে বিরোধী ও মানবাধিকারকর্মীদের একটি অংশের দাবি।
পুতিনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ভোট
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য নির্বাচনটি শুধু সংসদের নতুন সদস্য বেছে নেওয়ার বিষয় নয়। ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব, মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক চাপ এবং সম্ভাব্য নতুন সামরিক মোতায়েন নিয়ে সাধারণ মানুষের মনোভাবও এই নির্বাচনের ফলাফলে প্রতিফলিত হতে পারে।
পুতিন ভোটারদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তার বক্তব্যে ভোটকে দেশের ঐক্য এবং সামরিক বাহিনীর প্রতি জনসমর্থনের একটি সূচক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
ক্রেমলিনের জন্য ভোটার উপস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ যুদ্ধের কারণে জনগণের মধ্যে ক্লান্তি বা রাজনৈতিক অনাগ্রহ কতটা তৈরি হয়েছে, নির্বাচনী অংশগ্রহণের হার তার একটি ইঙ্গিত দিতে পারে।
যুদ্ধের প্রভাব পড়ছে অর্থনীতিতেও
ইউক্রেন যুদ্ধ রাশিয়ার অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। সামরিক ব্যয়, প্রতিরক্ষা উৎপাদন এবং সেনাদের বেতন-ভাতা ঘিরে সরকারি ব্যয় বেড়েছে। এর পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রুশ কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কঠিন অবস্থার মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে।
দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহ নিয়েও চাপ তৈরি হয়েছে। ইউক্রেনের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে কিছু এলাকায় জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ অবস্থায় নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলনও হতে পারে।
অধিকৃত ইউক্রেনীয় এলাকাতেও ভোট
রাশিয়া ইউক্রেনের যেসব অঞ্চলকে নিজেদের ভূখণ্ড হিসেবে দাবি করে, সেসব এলাকার রুশ নিয়ন্ত্রিত অংশেও ভোটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ইউক্রেন এ উদ্যোগের বিরোধিতা করেছে এবং এটিকে অবৈধ বলে অভিহিত করেছে।
অন্যদিকে রাশিয়ার কর্তৃপক্ষ এসব অঞ্চলকে নিজেদের রাজনৈতিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে।
এই বিষয়টি নির্বাচনের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক আরও বাড়িয়েছে।
বিরোধীদের জন্য সংকুচিত পরিসর
রাশিয়ায় রাজনৈতিক বিরোধিতার ওপর চাপ গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের সমালোচনাকে ঘিরে কঠোর আইন এবং বিভিন্ন মামলার কারণে প্রকাশ্য রাজনৈতিক বিরোধিতার সুযোগ সংকুচিত হয়েছে বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলো দাবি করে আসছে।
বিরোধী রাজনীতিকদের কেউ কারাগারে, কেউ বিদেশে অবস্থান করছেন। আবার অনেকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ হারিয়েছেন।
এমন পরিস্থিতিতে রুশ ভোটারদের একটি অংশ ব্যালটের মাধ্যমে অসন্তোষ প্রকাশের পথ খুঁজছেন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ফলাফলের চেয়ে বার্তাও গুরুত্বপূর্ণ
নির্বাচনের ফলাফল রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি ইউক্রেন যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়েও কিছু রাজনৈতিক বার্তা দিতে পারে।
বিশেষ করে ভোটার উপস্থিতি, বিভিন্ন দলের ভোটের ব্যবধান এবং ক্ষমতাসীন দলের সমর্থনের মাত্রা পর্যবেক্ষণ করবে রুশ নেতৃত্ব। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার পর সাধারণ মানুষের মনোভাব কোন দিকে যাচ্ছে, তার একটি ধারণা পাওয়ার চেষ্টা থাকবে ক্রেমলিনের।
তবে নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, বিরোধীদের অংশগ্রহণ এবং ভোটের পরিবেশ নিয়ে যে প্রশ্নগুলো উঠেছে, সেগুলো আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।
রাশিয়ার ৪৫০ আসনের ডুমা নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শেষ হবে ২০ সেপ্টেম্বর। এরপর ফলাফল প্রকাশের মাধ্যমে স্পষ্ট হবে নতুন সংসদের রাজনৈতিক কাঠামো। তবে তার আগেই এবারের নির্বাচন রাশিয়ার যুদ্ধকালীন রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে আলোচনায় উঠে এসেছে।
