জাম্বিয়ায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট হাকাইন্দে হিচিলেমা। তবে দ্বিতীয় মেয়াদে তাঁর ক্ষমতায় ফেরার আনন্দের মধ্যেই দেশটির রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে নতুন উত্তেজনা। নির্বাচনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ব্রায়ান মুন্ডুবিলে নিরাপত্তা হুমকির অভিযোগে আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানিয়েছে তাঁর দল।
১৩ আগস্ট অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফল ১৮ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে জাম্বিয়ার নির্বাচন কমিশন। এতে হিচিলেমা প্রায় ৬১ শতাংশ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন পার্টি ফর ইউনিটি অ্যান্ড প্রসপারিটির (NRPUP) নেতা ব্রায়ান মুন্ডুবিলে পেয়েছেন প্রায় ৩৮ শতাংশ ভোট। সরকারি হিসাবে হিচিলেমা পেয়েছেন ২৯ লাখ ৬৫ হাজার ৩২৬ ভোট, আর মুন্ডুবিলে পেয়েছেন ১৮ লাখ ৫৬ হাজার ২১৭ ভোট।
৬৪ বছর বয়সী হিচিলেমার জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সাফল্য। ২০২১ সালে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা শেষে তিনি প্রথমবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এবারও তাঁর জয় অনেকটা প্রত্যাশিত ছিল। নির্বাচনের পর সমর্থকদের উদ্দেশে হিচিলেমা বলেন, জনগণের দেওয়া আস্থায় তিনি অত্যন্ত সম্মানিত ও বিনীত বোধ করছেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, যারা তাঁকে ভোট দেননি তাদের জন্যও তাঁর সরকার কাজ করবে।
তবে ফল ঘোষণার আগে থেকেই নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন মুন্ডুবিলে। তাঁর দাবি, ভোটকেন্দ্রের ফলাফলের সঙ্গে পরে প্রকাশিত সরকারি ফলাফলের মধ্যে অসঙ্গতি রয়েছে। তাঁর দল নির্বাচনে অনিয়মের নথিবদ্ধ প্রমাণ রয়েছে দাবি করে ফলাফল চ্যালেঞ্জ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। হিচিলেমার দল অবশ্য এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
নির্বাচনের পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। মুন্ডুবিলের বাড়িতে সশস্ত্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান চালানো হয়। তাঁর অভিযোগ, সাঁজোয়া যান দিয়ে বাড়ির গেট ভেঙে ফেলা হয়, দরজা-জানালা ক্ষতিগ্রস্ত করা হয় এবং গুলিও চালানো হয়। অন্যদিকে সরকার দাবি করেছে, ওই অভিযানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর গুলি চালানো হয়েছিল এবং সেখানে সামরিক মানের অস্ত্র পাওয়া যায়। কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, কয়েকজন বিরোধী নেতা সশস্ত্র বিদ্রোহের পরিকল্পনা করছিলেন। মুন্ডুবিলে এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে অস্বীকার করেছেন।
এই ঘটনার পর মুন্ডুবিলে ও তাঁর রানিংমেট মেকেবি জুলু নিরাপত্তার কারণে আত্মগোপনে যান। তাঁর দল জানিয়েছে, মুন্ডুবিলে একটি নিরাপদ স্থানে রয়েছেন এবং একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার সুরক্ষা পাচ্ছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তিনি সরাসরি জাম্বিয়ার জনগণ ও গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলবেন বলেও দলটি জানিয়েছে।
নির্বাচন পর্যবেক্ষণ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ভোট গণনার এক পর্যায়ে নির্বাচন কমিশন গণনা সাময়িকভাবে স্থগিত করেছিল। কিছু এলাকায় ভোটকর্মীদের ওপর হামলা এবং চিহ্নিত ব্যালট পেপার চুরির অভিযোগ ওঠে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর্যবেক্ষকরা নির্বাচনে প্রচার ও রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে কিছু উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধানও বিরোধী নেতাদের গ্রেপ্তার ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন।
তবে জাম্বিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তরের একটি শক্তিশালী ঐতিহ্য রয়েছে। ১৯৯১ সালে বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরে আসার পর দেশটিতে একাধিকবার নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তন হয়েছে। হিচিলেমা তাঁর বিজয় ভাষণে এই ঐতিহ্যের কথাই তুলে ধরে বলেন, জাম্বিয়া এমন একটি গণতান্ত্রিক দেশ যেখানে মতবিরোধের সমাধান ব্যালট বাক্সের মাধ্যমে হওয়া উচিত।
অর্থনীতিও হিচিলেমার দ্বিতীয় মেয়াদের অন্যতম বড় পরীক্ষা হবে। ২০২১ সালে ক্ষমতায় আসার সময় জাম্বিয়া বড় ধরনের ঋণসংকটের মধ্যে ছিল। তাঁর সরকার ঋণ পুনর্গঠন, আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং খনি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর দিকে জোর দিয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়, বিদ্যুৎ সংকট ও অর্থনৈতিক সুফল সবার কাছে সমানভাবে না পৌঁছানোর অভিযোগ এখনো রয়েছে।
ফলে হিচিলেমার দ্বিতীয় মেয়াদ একদিকে অর্থনৈতিক সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ, অন্যদিকে রাজনৈতিক বিরোধ ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাব দেওয়ার কঠিন পরীক্ষা। নির্বাচনের ফল নিয়ে মুন্ডুবিলে আইনি লড়াই শুরু করলে জাম্বিয়ার রাজনীতি আরও উত্তপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
