ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে নজিরবিহীন রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করেছে বিরোধী দলগুলোর জোট ‘ইন্ডিয়া’। ভোটার তালিকা সংশোধন ও নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগ তুলে তাকে প্রতীকীভাবে ‘ইমপিচমেন্ট’ বা অভিশংসনের মুখোমুখি করেছে বিরোধী শিবির। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের বাসভবনে আয়োজিত এই ব্যতিক্রমী অধিবেশনে সাবেক লোকসভা স্পিকার মীরা কুমার সভাপতিত্ব করেন। বিরোধীদের দাবি, নির্বাচন কমিশনের বর্তমান নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের রাজনৈতিক ও নৈতিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতেই এই প্রতীকী আয়োজন।
তবে এই কর্মসূচির কোনো সাংবিধানিক বা আইনি কার্যকারিতা নেই। ভারতের সংবিধানে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের জন্য নির্দিষ্ট সংসদীয় প্রক্রিয়া রয়েছে। সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে বিরোধীদের আয়োজনটি মূলত রাজনৈতিক প্রতিবাদ ও জনমত তৈরির উদ্যোগ। তবু দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদকে কেন্দ্র করে এমন কর্মসূচি ভারতের রাজনীতিতে বিরল ঘটনা হিসেবে আলোচনায় এসেছে।
কেন এই প্রতীকী অভিশংসন
বিরোধীদের অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন কার্যক্রম। তাদের দাবি, এই প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই তালিকা পরিবর্তন করা হয়েছে। এতে প্রকৃত ভোটারদের ভোটাধিকার হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছে বিরোধী জোট।
কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে প্রতীকী অধিবেশনে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ছয়টি অভিযোগ তুলে ধরেন। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে ভোটার তালিকা সংশোধনে অনিয়ম, সংসদীয় অনুমোদন ছাড়া নির্বাচনী ফরম ও পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা, নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতার ঘাটতি এবং কমিশনের অন্য সদস্যদের যথাযথভাবে সম্পৃক্ত না করা। বিরোধীদের দাবি, এসব কর্মকাণ্ডের ফলে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তাদের আরও অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়ার ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, সংখ্যালঘু এবং দরিদ্র মানুষের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিয়ে বিরোধী ও ক্ষমতাসীন পক্ষের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ রয়েছে।
খাড়গে ও রাহুলের বক্তব্য
প্রতীকী অধিবেশনে খাড়গে বলেন, ভারতের সংবিধানে স্বীকৃত সর্বজনীন ভোটাধিকার গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। সেই অধিকার কোনোভাবেই প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বা অস্পষ্ট প্রক্রিয়ার কারণে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে না। তার মতে, নির্বাচন কমিশনের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীও কর্মসূচিতে বক্তব্য দেন। তিনি নির্বাচন কমিশনের প্রধানকে উদ্দেশ করে বলেন, ভোটাধিকার ক্ষুণ্ন করার অভিযোগের জবাব একদিন দিতেই হবে। তার বক্তব্যে ক্ষমতাসীন বিজেপি নেতৃত্বের বিরুদ্ধেও অভিযোগ তোলা হয়। বিরোধীদের দাবি, নির্বাচন কমিশনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা না গেলে নির্বাচনী প্রতিযোগিতার সমান সুযোগ নষ্ট হবে।
অনুষ্ঠানে কংগ্রেসের শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি বিভিন্ন বিরোধী দলের সংসদ সদস্য, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়েছে বলে দাবি করা কয়েকজন নাগরিক অংশ নেন। সাবেক স্পিকার মীরা কুমারের সভাপতিত্বে আয়োজনটি অনেকটা সংসদীয় শুনানির আদলে পরিচালিত হয়। অভিযোগ উত্থাপন, বক্তব্য এবং প্রস্তাবের মাধ্যমে প্রতীকী অভিশংসন সম্পন্ন করা হয়।
আইনগতভাবে কী সম্ভব, কী নয়
ভারতের সংবিধান অনুযায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের প্রক্রিয়া সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিকে অপসারণের প্রক্রিয়ার কাছাকাছি। সংসদের উভয় কক্ষে বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমর্থন প্রয়োজন হয়। এরপর রাষ্ট্রপতির আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপের মাধ্যমে অপসারণ কার্যকর হতে পারে। ফলে কোনো রাজনৈতিক দল বা জোটের প্রতীকী অধিবেশন আয়োজন করলেই প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদ চলে যায় না।
বিরোধীরা অবশ্য বলছে, সংসদীয় প্রক্রিয়ায় তাদের উদ্যোগ বাধার মুখে পড়ায় জনসমক্ষে এই প্রতীকী কর্মসূচি আয়োজন করতে হয়েছে। তাদের দাবি, সংসদের ভেতরে অভিযোগ উত্থাপনের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন বিরোধীদের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের বক্তব্য, ভোটার তালিকা সংশোধনের উদ্দেশ্য হলো তালিকাকে নির্ভুল করা, কোনো নির্দিষ্ট দলকে সুবিধা দেওয়া নয়।
বিতর্কের রাজনৈতিক প্রভাব
প্রতীকী অভিশংসন কর্মসূচির পরদিন রামলীলা ময়দানে বিরোধীদের বড় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ফলে দুই দিনের কর্মসূচি মিলিয়ে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিরোধীদের প্রচার আরও জোরালো হয়েছে। একদিকে তারা ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে জনমত গড়ে তুলতে চাইছে, অন্যদিকে বিজেপি এই আন্দোলনকে রাজনৈতিক নাটক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।
এই বিতর্কের প্রভাব শুধু দিল্লির রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ভোটার তালিকা সংশোধন এবং আসন্ন নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে পারে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, সেখানে প্রশাসনিক যাচাই ও আপিলের প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
শেষ পর্যন্ত প্রতীকী ‘ইমপিচমেন্ট’ জ্ঞানেশ কুমারের পদে সরাসরি কোনো পরিবর্তন আনবে না। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা সহজে থামার সম্ভাবনা নেই। বিরোধীদের রাজনৈতিক চাপ কতটা কার্যকর হয়, তা নির্ভর করবে তারা অভিযোগের পক্ষে কতটা প্রমাণ হাজির করতে পারে এবং সাধারণ ভোটারদের উদ্বেগকে কতটা বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ দিতে পারে তার ওপর।
