জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন আর শুধু পরিবেশগত সংকট নয়; ইউরোপের অর্থনীতির ওপরও এর বিশাল চাপ তৈরি হয়েছে। ইউরোপীয় পরিবেশ সংস্থার (EEA) তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে আবহাওয়া ও জলবায়ুজনিত চরম ঘটনাগুলোর কারণে সম্পদের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে আনুমানিক ৮২২ বিলিয়ন ইউরো।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই ক্ষতির বড় একটি অংশ সাম্প্রতিক বছরগুলোতেই হয়েছে। ২০২১ থেকে ২০২৪—মাত্র চার বছরেই ক্ষতির পরিমাণ ২০৮ বিলিয়ন ইউরোর বেশি, যা মোট ক্ষতির প্রায় এক-চতুর্থাংশ।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতি বন্যা ও ঝড়ে
EEA-এর হিসাব অনুযায়ী, ১৯৮০–২০২৪ সময়ের মোট ক্ষতির সবচেয়ে বড় অংশ এসেছে বন্যার মতো জলসংক্রান্ত দুর্যোগ থেকে। মোট ক্ষতির প্রায় ৪৭ শতাংশের জন্য দায়ী হাইড্রোলজিক্যাল বা জলসংক্রান্ত চরম ঘটনা।
এরপর রয়েছে ঝড়, বজ্রপাত ও শিলাবৃষ্টির মতো আবহাওয়াজনিত ঘটনা। এগুলো মোট ক্ষতির প্রায় ২৭ শতাংশের জন্য দায়ী। তাপপ্রবাহও বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়েছে এবং মোট ক্ষতির প্রায় ১৮ শতাংশের সঙ্গে যুক্ত। বাকি অংশ এসেছে খরা, দাবানল, তীব্র শীত ও তুষারপাতসহ অন্যান্য ঘটনা থেকে।
শুধু ঘরবাড়ি নয়, অর্থনীতিও ঝুঁকিতে
চরম আবহাওয়ার কারণে কোনো একটি অঞ্চলে বন্যা বা দাবানল হলে শুধু ব্যক্তিগত সম্পদই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাস্তা, সেতু, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, কৃষি, শিল্প প্রতিষ্ঠান ও পরিবহন অবকাঠামো।
এর ফলে সরকারের ওপর পুনর্গঠন ও জরুরি সহায়তার ব্যয় বাড়ে। অর্থাৎ জলবায়ু বিপর্যয় একদিকে মানুষের জীবন ও সম্পদের ক্ষতি করে, অন্যদিকে রাষ্ট্রের বাজেটের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করে।
রয়টার্সের বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, ইউরোপে জলবায়ুজনিত দুর্যোগ ক্রমেই এমন আর্থিক চাপে পরিণত হচ্ছে যা এককালীন বাজেট ধাক্কার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সমস্যা তৈরি করতে পারে।
বীমার ঘাটতিও বড় সমস্যা
জলবায়ু বিপর্যয়ের আরেকটি বড় সমস্যা হলো ক্ষতির তুলনায় বীমা সুরক্ষা কম থাকা। ফলে বড় ধরনের বন্যা, ঝড় বা দাবানলের পর ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠনের বড় অংশ সরকার ও জনগণের ওপর পড়ে।
এ অবস্থায় ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জলবায়ু ঝুঁকির বিরুদ্ধে বীমা কাভারেজ বাড়ানো এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় বিনিয়োগ বৃদ্ধির আলোচনা চলছে। কারণ ভবিষ্যতে চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও ঘন ঘন এবং তীব্র হলে ক্ষতির পরিমাণও বাড়তে পারে।
ইউরোপের জন্য সতর্কবার্তা
EEA সতর্ক করেছে, চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও তীব্র হলে সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক ক্ষতিও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে এসব ক্ষতি জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি করে।
ফলে ইউরোপের সামনে এখন শুধু কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রশ্ন নয়; একই সঙ্গে শহর, কৃষি, পানি, বিদ্যুৎ ও পরিবহন ব্যবস্থাকে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
৮২২ বিলিয়ন ইউরোর ক্ষতির হিসাব তাই শুধু একটি অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নয়। এটি ইউরোপের জন্য একটি বড় সতর্ক সংকেত—জলবায়ু পরিবর্তনের মূল্য ইতোমধ্যেই দিতে হচ্ছে, আর ভবিষ্যতে সেই মূল্য আরও বাড়তে পারে।
