মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত সংঘাতের নতুন রণক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে ইয়েমেন। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় গুরুত্বপূর্ণ শহর এডেনের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অভিযোগ উঠেছে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে। ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর দাবি, হুতিরা একযোগে গুরুত্বপূর্ণ দুটি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। এর আগে একই এলাকায় হামলায় প্রাণহানি ও আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। নতুন এই হামলার অভিযোগে দেশটির রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
৩০ অক্টোবর ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর একজন মুখপাত্র জানান, হুতি যোদ্ধারা এডেন বিমানবন্দর এবং আল-মাশিক প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ কমপ্লেক্স লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। তবে হামলায় কতজন হতাহত হয়েছেন, স্থাপনাগুলোর কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে কিংবা ক্ষেপণাস্ত্রগুলো নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করেছে কি না, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
এই হামলার অভিযোগ এমন সময়ে এসেছে, যখন ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। ইয়েমেনের হুতিরা সৌদি আরবের সঙ্গে নতুন করে সংঘর্ষে জড়িয়েছে। ফলে দেশটির অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ আবারও আঞ্চলিক সামরিক সংকটে রূপ নিচ্ছে।
এডেন বিমানবন্দর কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
এডেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগকেন্দ্র। দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার রাজধানী সানা থেকে সরে আসার পর এডেনকে তাদের প্রধান রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে আসছে।
বিমানবন্দরটি শুধু যাত্রী পরিবহনের জন্য নয়, সরকারি কর্মকর্তা, কূটনীতিক, ত্রাণকর্মী ও জরুরি সরঞ্জাম পরিবহনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণে বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অভিযোগকে সাধারণ সামরিক ঘটনা হিসেবে দেখছে না ইয়েমেনের সরকার। তাদের আশঙ্কা, এ ধরনের হামলার মাধ্যমে সরকারি প্রশাসনের কার্যক্রম ব্যাহত করা এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা চলছে।
৩০ অক্টোবরের আগে ২৮ অক্টোবরও বিমানবন্দর এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর পাওয়া যায়। পরপর হামলার কারণে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট প্রাসাদেও হামলার অভিযোগ
এডেনের আল-মাশিক প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্র। প্রেসিডেন্টের কার্যালয় ও সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের সঙ্গে এই স্থাপনাটি যুক্ত।
এর আগে ১৫ অক্টোবর হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রাসাদ কমপ্লেক্সে পাঁচজন নিহত এবং ১৬ জন আহত হয়েছিলেন বলে ইয়েমেনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল। নিহতদের মধ্যে নিরাপত্তাকর্মী ও বেসামরিক সরকারি কর্মচারী ছিলেন।
সরকারি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই হামলায় পাঁচটি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে হুতিদের বক্তব্য ছিল, তারা সৌদি সামরিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত একটি স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।
হামলার সময় প্রধানমন্ত্রী শায়া আল-জিন্দানি এবং মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যরা নিরাপদে ছিলেন বলে জানানো হয়েছিল।
নতুন করে একই প্রাসাদ কমপ্লেক্স লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ ওঠায় সরকারের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
সৌদি আরবের সঙ্গে হুতিদের সংঘাত কেন বাড়ছে?
ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধের ইতিহাস দীর্ঘ। ২০১৪ সালে হুতিরা রাজধানী সানা দখল করার পর দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার ক্ষমতা হারায় এবং দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থান নেয়।
পরবর্তী সময়ে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ইয়েমেন সরকারের পক্ষে হস্তক্ষেপ করে। দীর্ঘ সংঘাতের পর ২০২২ সালে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও দেশটির রাজনৈতিক সংকটের স্থায়ী সমাধান হয়নি।
সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনী ও হুতিদের মধ্যে আবারও সংঘর্ষ বেড়েছে। সরকারি বাহিনী হুতিদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা পুনর্দখলের অভিযান শুরু করেছে। অন্যদিকে হুতিরা সৌদি আরবের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও বিমানবন্দর লক্ষ্য করে হামলার হুমকি দিয়েছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটও হুতিদের হামলার জবাবে সামরিক অভিযান চালিয়েছে। ফলে ইয়েমেনের সংঘাত নতুন করে আঞ্চলিক যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছে।
বাব আল-মানদেব প্রণালি নিয়েও উদ্বেগ
ইয়েমেনের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দেশটির সংঘাত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থলে রয়েছে বাব আল-মানদেব প্রণালি। এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে জাহাজ চলাচলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ এটি।
এই জলপথে অস্থিরতা তৈরি হলে জাহাজগুলোকে দীর্ঘ বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হতে পারে। এতে পরিবহন ব্যয়, বীমা খরচ এবং পণ্য সরবরাহের সময় বেড়ে যায়।
হুতিদের সামুদ্রিক হামলার অতীত কর্মকাণ্ডের কারণে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এমনিতেই সতর্ক। এবার এডেনের বিমানবন্দর ও সরকারি স্থাপনায় হামলার অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
হুতিদের অবস্থান ও আঞ্চলিক শক্তির হিসাব
হুতিরা নিজেদের ইয়েমেনের রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরে এবং সৌদি-সমর্থিত সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক রয়েছে।
তবে প্রতিটি হামলার পেছনে ইরানের সরাসরি নির্দেশনা রয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ সব ক্ষেত্রে পাওয়া যায় না।
বর্তমান আঞ্চলিক সংঘাতে হুতিদের অবস্থান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, তাদের হামলা সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো, বিমানবন্দর এবং লোহিত সাগরের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে প্রভাব ফেলতে পারে।
ইয়েমেনে কি আবার পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হচ্ছে?
এডেন বিমানবন্দর ও প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে নতুন হামলার অভিযোগ দেশটির যুদ্ধবিরতি ও রাজনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনাকে আরও দুর্বল করছে। দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধে ইয়েমেনের অর্থনীতি, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও খাদ্য সরবরাহ ইতিমধ্যে বিপর্যস্ত।
নতুন করে সামরিক সংঘাত বাড়লে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে। বিশেষ করে বাস্তুচ্যুত পরিবার, শিশু এবং চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত মানুষের পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে।
সব মিলিয়ে, এডেনের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও যোগাযোগ অবকাঠামো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অভিযোগ ইয়েমেনের সংঘাতকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। হুতিদের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর লড়াই এখন সৌদি আরবের নিরাপত্তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর সংঘাতের সঙ্গেও জড়িয়ে গেছে। আগামী দিনে পাল্টাপাল্টি হামলা বাড়লে শুধু ইয়েমেন নয়, পুরো আরব উপদ্বীপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
