ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে টানা তৃতীয় দিনের মতো বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও সংঘর্ষে অস্থির হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলো। ঢাকা, গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়াসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের আন্দোলনে বহু কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। কোথাও কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে, কোথাও শ্রমিকদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করলেও শ্রমিকদের অসন্তোষ পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি।
শ্রমিকদের প্রধান দাবি, বর্তমান বাজারদর ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করতে হবে। তাদের বক্তব্য, খাদ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত ও সন্তানের পড়াশোনার খরচ যেভাবে বেড়েছে, তাতে বর্তমান বেতনে পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে মালিকপক্ষ বলছে, বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা, উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি অনিশ্চয়তা এবং ক্রয়াদেশের চাপের মধ্যে এক ধাপে এত বড় মজুরি বৃদ্ধি বাস্তবায়ন কঠিন।
শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ ও সংঘর্ষ
শনিবার থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন রোববার আরও বিস্তৃত হয়। সোমবারও বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে। ঢাকার মিরপুর, গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়ায় শ্রমিকেরা সড়কে নেমে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে স্লোগান দেন। কয়েকটি এলাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক ও শিল্পাঞ্চলের প্রবেশপথে অবরোধের কারণে পণ্য পরিবহন এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াত ব্যাহত হয়।
বিক্ষোভের সময় কয়েকটি স্থানে শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। কোথাও ইটপাটকেল নিক্ষেপ, ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। গাজীপুরের কয়েকটি স্থানে যানবাহন ও স্থাপনায় হামলার খবর পাওয়া গেছে। সাভার ও আশুলিয়ার কিছু কারখানায় ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনায় শ্রমিক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং সাংবাদিকদের কেউ কেউ আহত হয়েছেন।
শিল্প মালিকদের সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী, রোববার ঢাকাসহ কয়েকটি শিল্পাঞ্চলে ৫২৯টি কারখানার কার্যক্রম ব্যাহত হয়। প্রায় ৯ লাখ ৮৭ হাজার শ্রমিক কর্মস্থল ছেড়ে বেরিয়ে যান। সোমবার পরিস্থিতি বিবেচনায় সাভার ও আশুলিয়ার ২৬৪টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকাতেও বহু কারখানায় উৎপাদন বন্ধ বা সীমিত রাখতে হয়েছে। তবে সব কারখানা একযোগে বন্ধ ছিল না; কিছু কারখানা সোমবার উৎপাদন শুরু করলেও আশপাশের বিক্ষোভের কারণে উদ্বেগ কাটেনি।
৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবি কেন
শ্রমিকদের দাবি, বর্তমান ন্যূনতম মজুরি দিয়ে শহরাঞ্চলে নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। চাল, ডাল, তেল, সবজি, মাছ-মাংসের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি বাসাভাড়া ও চিকিৎসা ব্যয়ও বেড়েছে। অনেক শ্রমিককে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ছোট বাসায় থাকতে হয়, আবার অনেকে কর্মস্থল থেকে দূরে কম খরচের এলাকায় বসবাস করে প্রতিদিন দীর্ঘ পথ পাড়ি দেন।
তাদের মতে, পোশাকশিল্প দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস হলেও এই খাতের শ্রমিকেরা উৎপাদনের সুফল থেকে যথেষ্ট অংশ পাচ্ছেন না। শ্রমিক নেতাদের বক্তব্য, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছ থেকে পণ্যের ন্যায্য দাম আদায় করতে না পারার দায় শ্রমিকদের ওপর চাপানো উচিত নয়। উৎপাদন ব্যয় বাড়লে মালিকদের ক্রেতাদের সঙ্গে দরকষাকষি বাড়াতে হবে।
শ্রমিকদের আরেকটি দাবি হলো, আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে কোনো শ্রমিককে যেন চাকরিচ্যুত বা কালো তালিকাভুক্ত করা না হয়। যেসব শ্রমিক আগে বরখাস্ত হয়েছেন, তাদের পুনর্বহালের দাবিও উঠেছে। ফলে আন্দোলনটি শুধু মজুরি বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও শ্রমিক অধিকারও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
সরকারের উদ্যোগ ও মালিকপক্ষের উদ্বেগ
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ছয় সদস্যের একটি নতুন ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। বোর্ডের কাজ হবে পোশাকশ্রমিকদের বর্তমান বেতন কাঠামো, জীবনযাত্রার ব্যয়, শিল্পের সক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রস্তাব বিবেচনা করে নতুন মজুরি নির্ধারণের সুপারিশ করা। সরকার শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান জানিয়েছে এবং কারখানার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে কারখানার কার্যক্রম সচল রাখা এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। সরকারের অবস্থান, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি বিবেচনা করতে হবে, তবে সহিংসতা ও ভাঙচুরের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
অন্যদিকে মালিকপক্ষের আশঙ্কা, হঠাৎ করে মজুরি অনেক বাড়ানো হলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশকে চীন, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও ভারতের মতো উৎপাদক দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হয়। ক্রেতারা যদি বাড়তি ব্যয় মেনে নিতে না চান, তাহলে অর্ডার অন্য দেশে চলে যেতে পারে। তবে শ্রমিকদের বক্তব্য, কম মজুরির ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে শিল্প টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
রপ্তানি ও কর্মসংস্থানে ঝুঁকি
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প দেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি জোগান দেয়। এ খাতে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থান রয়েছে। জাতীয় অর্থনীতিতেও শিল্পটির অবদান উল্লেখযোগ্য। ফলে কয়েক দিন উৎপাদন ব্যাহত হলেও এর প্রভাব কারখানার বাইরে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকলে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ কঠিন হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে সময়মতো চালান পাঠাতে না পারলে জরিমানা, অর্ডার বাতিল কিংবা ভবিষ্যৎ ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে বছরের শেষ ভাগে নতুন অর্ডার ও সরবরাহের সময়সূচি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় বর্তমান অস্থিরতা মালিকদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
তবে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান কেবল শ্রমিকদের কাজে ফেরানোর মধ্যে নেই। শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মজুরি, মালিকদের ব্যবসায়িক সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের ন্যায্য মূল্য দেওয়ার বিষয়গুলো একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য সমাধান না এলে আন্দোলন দীর্ঘায়িত হওয়ার পাশাপাশি দেশের প্রধান রপ্তানি খাতেও অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে।
