ভুটানের উত্তরাঞ্চলে হিমবাহের একটি হ্রদ উপচে নেমে আসা পানিতে আকস্মিক বন্যা দেখা দিয়েছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, সেতু এবং পর্যটন অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে আগাম সতর্কতা ও সময়মতো এলাকা খালি করার কারণে এখন পর্যন্ত কোনো প্রাণহানি বা আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। বন্যার পানিতে জনপ্রিয় উষ্ণ প্রস্রবণকেন্দ্র গাসা ছাচুর বিভিন্ন স্থাপনা ভেসে গেছে। একই সঙ্গে গাসা ও লায়া অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গত ২৯ অক্টোবর রাতে শিনতাফু হ্রদ থেকে পানি উপচে এই আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়। হিমবাহের বরফ গলে তৈরি হওয়া হ্রদ থেকে বিপুল পরিমাণ পানি একসঙ্গে নিচের দিকে নেমে আসায় নদীর পানি দ্রুত বেড়ে যায়। প্রবল স্রোত গাসা ও পুনাখা অঞ্চলের বিভিন্ন স্থাপনা, সড়ক এবং সেতুর ওপর দিয়ে বয়ে যায়। বন্যার পর স্থানীয় প্রশাসন ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ ও যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু করেছে।
রাতের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পর্যটনকেন্দ্র
গাসা ছাচু ভুটানের উত্তরাঞ্চলের একটি পরিচিত প্রাকৃতিক উষ্ণ প্রস্রবণকেন্দ্র। পাহাড়ি পরিবেশ ও প্রাকৃতিক গরম পানির জন্য জায়গাটি পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে জনপ্রিয়। আকস্মিক বন্যায় এই কেন্দ্রের বিভিন্ন স্থাপনা পানির তোড়ে ভেসে গেছে। বন্যার স্রোত এতটাই প্রবল ছিল যে, ঘটনাস্থলে থাকা অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি তাৎক্ষণিকভাবে নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি।
রাতের অন্ধকার ও পানির তীব্র স্রোতের কারণে উদ্ধার ও পরিদর্শন কার্যক্রমও কঠিন হয়ে পড়ে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, কয়েকটি অস্থায়ী সেতু পানির তোড়ে ভেসে গেছে। স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পরিদর্শন করছেন।
সবচেয়ে বড় স্বস্তির বিষয়, বন্যার আগেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। ফলে বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলো পুনর্নির্মাণ এবং সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক করতে সময় লাগতে পারে।
সড়ক ও সেতু যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন
বন্যার পানিতে পুনাখা-গাসা সেকেন্ডারি জাতীয় মহাসড়কের কয়েকটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গাসা-লায়া সড়কেরও কিছু অংশ ধুয়ে গেছে। ফলে লায়া গ্রামের সঙ্গে যোগাযোগে বড় বাধা তৈরি হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় সংশ্লিষ্ট এলাকায় যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে।
পুনাখা অঞ্চলে একটি বেইলি সেতু পানির তোড়ে ভেসে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। পাহাড়ি অঞ্চলে এ ধরনের সেতু অনেক সময় প্রত্যন্ত এলাকার সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি পণ্য পরিবহন ও জরুরি সেবার ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।
প্রশাসনের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও সেতুগুলো কত দ্রুত মেরামত করা যায়। পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধস, নদীর স্রোত এবং আবহাওয়ার অনিশ্চয়তার কারণে পুনর্গঠনকাজ সহজ নয়। নতুন করে বন্যার আশঙ্কা থাকলে উদ্ধার ও মেরামত কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
হিমবাহের হ্রদ উপচে বন্যা কেন হয়
হিমবাহের বরফ গলে পাহাড়ি এলাকায় অনেক সময় প্রাকৃতিক হ্রদ তৈরি হয়। এসব হ্রদের পানি সাধারণত বরফ, পাথর, মাটি কিংবা প্রাকৃতিক বাঁধের মাধ্যমে আটকে থাকে। কিন্তু তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অতিরিক্ত বরফ গলা, ভূমিধস, পাথর ধস কিংবা হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ দুর্বল হয়ে পড়লে হঠাৎ বিপুল পানি বেরিয়ে আসতে পারে। এ ধরনের ঘটনাকে হিমবাহের হ্রদ উপচে সৃষ্ট বন্যা বলা হয়।
এ ধরনের বন্যার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, পানি অল্প সময়ের মধ্যে পাহাড়ের নিচের জনবসতি ও অবকাঠামোয় পৌঁছে যেতে পারে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের তুলনায় পানির পরিমাণ ও স্রোতের গতি অনেক বেশি হওয়ায় সড়ক, সেতু, বাড়িঘর এবং কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। পাহাড়ি উপত্যকায় বসবাসকারী মানুষ বিশেষভাবে ঝুঁকিতে থাকেন।
ভুটানের মতো হিমালয়ঘেঁষা দেশে হিমবাহের হ্রদ পর্যবেক্ষণ তাই গুরুত্বপূর্ণ। তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে হিমবাহ গলার হার এবং হ্রদের আয়তন পরিবর্তিত হতে পারে। ফলে আগে নিরাপদ বলে বিবেচিত এলাকাও নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
আগের বন্যার স্মৃতি, বাড়ছে সতর্কতার প্রয়োজন
গাসা ছাচু এলাকা আগেও আকস্মিক বন্যার মুখে পড়েছিল। ২০২১ সালে মোচু নদীর প্রবাহপথ পরিবর্তনের কারণে সেখানে বন্যা দেখা দেয়। নতুন ঘটনার পর স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রশাসনের মধ্যে পাহাড়ি নদী এবং হিমবাহের হ্রদ পর্যবেক্ষণ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
বর্তমান ঘটনায় প্রাণহানি না ঘটলেও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি দেখিয়ে দিয়েছে, পাহাড়ি অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি কত দ্রুত বাস্তব বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে পর্যটনকেন্দ্র, সড়ক ও সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে বন্যার সম্ভাব্য পথ এবং নদীর প্রবাহ বিবেচনা করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঝুঁকিপূর্ণ হ্রদগুলোর পানির স্তর নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি পাহাড়ি সড়ক ও সেতু নির্মাণে জলপ্রবাহের সম্ভাব্য চাপ বিবেচনায় নিতে হবে।
ভুটানের সাম্প্রতিক বন্যা আপাতত প্রাণহানি ছাড়াই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক, সেতু ও পর্যটন অবকাঠামো পুনরুদ্ধারে বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঘটার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করে মানুষ ও সম্পদ রক্ষার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর করা যায়।
