ব্রাজিলের রাজনীতিতে আবারও ইতিহাস গড়লেন লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। প্রথম দফার ভোটে পিছিয়ে পড়ার পর নাটকীয় প্রত্যাবর্তন ঘটিয়ে চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। ৮০ বছর বয়সী এই বামপন্থী নেতার জয় শুধু ব্রাজিলের ক্ষমতার পালাবদল নয়; লাতিন আমেরিকায় সাম্প্রতিক সময়ে জোরালো হয়ে ওঠা ডানপন্থী রাজনৈতিক প্রবণতার মধ্যেও নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী আঞ্চলিক নেতাদের জন্য লুলার এই জয় নতুন কূটনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করতে পারে।
গত ২৫ অক্টোবরের দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে ডানপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোকে পরাজিত করেন লুলা। প্রথম দফায় ফ্লাভিওর কাছে পিছিয়ে থাকলেও শেষ পর্যন্ত প্রায় ৫১ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট পেয়ে জয় নিশ্চিত করেন তিনি। বিপরীতে ফ্লাভিও পান প্রায় ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ ভোট। কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে ভোটের ব্যবধান উল্টে দেওয়ার এই ঘটনা ব্রাজিলের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত প্রত্যাবর্তন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রথম দফার ধাক্কা থেকে শেষ মুহূর্তের জয়
নির্বাচনের প্রথম পর্বে লুলার পরাজয় অনেক পর্যবেক্ষককে বিস্মিত করেছিল। ফ্লাভিও বলসোনারো পেয়েছিলেন প্রায় ৪৭ শতাংশ ভোট, আর লুলার পক্ষে ভোট পড়ে প্রায় ৪৫ শতাংশ। এতে স্পষ্ট হয়ে যায়, ব্রাজিলের ভোটারদের মধ্যে ডানপন্থী রাজনীতির সমর্থন এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী। সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ধরে রাখার চেষ্টা করেছিলেন তাঁর ছেলে ফ্লাভিও। অর্থনীতি, নিরাপত্তা, সরকারি ব্যয় এবং দুর্নীতির মতো বিষয়গুলোকে সামনে রেখে তিনি প্রচার চালান।
দ্বিতীয় দফায় লুলার প্রচারণার কৌশলে পরিবর্তন আসে। বামপন্থী সমর্থকদের পাশাপাশি মধ্যপন্থী ভোটার, প্রথম দফায় অন্য প্রার্থীদের ভোট দেওয়া মানুষ এবং ভোটদানে অনাগ্রহীদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সরাসরি জনসংযোগেও জোর দেওয়া হয়। বিশেষ করে হোয়াটসঅ্যাপভিত্তিক প্রচারণা এবং অনলাইন সমর্থকদের সংগঠিত করার উদ্যোগ ভোটের শেষ পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন।
তবে ফল ঘোষণার পরও রাজনৈতিক উত্তেজনা কমেনি। ফ্লাভিও বলসোনারো নির্বাচনের ফল চ্যালেঞ্জ করার কথা জানিয়েছেন। ভোটের সময়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁর সমর্থকেরা। যদিও এখন পর্যন্ত ফল বাতিল করার মতো জালিয়াতির নির্ভরযোগ্য প্রমাণ সামনে আসেনি।
লাতিন আমেরিকায় ডানপন্থী প্রবণতার মধ্যে ব্যতিক্রম
গত দেড় বছরে লাতিন আমেরিকার একাধিক দেশে রক্ষণশীল ও ডানপন্থী প্রার্থীদের নির্বাচনী সাফল্য আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন প্রবণতার ইঙ্গিত দিয়েছে। অপরাধ, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় ক্ষুব্ধ ভোটারদের একটি অংশ কঠোর নিরাপত্তানীতি ও বাজারমুখী অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতির দিকে ঝুঁকেছেন। এমন সময়ে ব্রাজিলে লুলার জয় এই ধারার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম।
ব্রাজিল লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক কূটনীতিতে প্রভাবশালী রাষ্ট্র। ফলে দেশটির প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক অবস্থান প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। লুলা ঐতিহ্যগতভাবে আঞ্চলিক সহযোগিতা, বহুপক্ষীয় কূটনীতি এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে আসছেন। তাঁর নতুন মেয়াদে দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য, জ্বালানি, অবকাঠামো ও পরিবেশগত সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ আবারও গুরুত্ব পেতে পারে।
তবে লাতিন আমেরিকার বামপন্থী সরকারগুলোর মধ্যে নীতিগত ও কৌশলগত পার্থক্য রয়েছে। ফলে লুলার জয়কে পুরো অঞ্চলে বামপন্থীদের পুনরুত্থান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি দেখিয়েছে, রাজনৈতিক মেরুকরণ ও ডানপন্থী উত্থানের মধ্যেও নির্বাচনী ফল নির্ভর করতে পারে স্থানীয় অর্থনীতি, প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা এবং ভোটারদের জোট গঠনের ওপর।
ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক কোন পথে
লুলার পররাষ্ট্রনীতির সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর একটি হতে পারে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক। ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ব্রাজিলের বাণিজ্য ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন আগে থেকেই রয়েছে। শুল্ক, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, আমাজন বন সংরক্ষণ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে দুই দেশের অবস্থানে পার্থক্য দেখা গেছে।
লুলা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন কিছু আঞ্চলিক নিরাপত্তা উদ্যোগে অংশ নিতে অনাগ্রহ দেখিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি চীন, ইউরোপ, আফ্রিকা এবং অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৈচিত্র্যময় করার পক্ষে। ব্রাজিলের বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ, বিশেষ করে বিরল মৃত্তিকা ও নিওবিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, দেশটিকে আন্তর্জাতিক দর-কষাকষিতে বাড়তি গুরুত্ব দেয়।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি সংঘাতমুখী হওয়ার সম্ভাবনাও সীমিত। ব্রাজিলের রপ্তানি, বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতার ক্ষেত্রে মার্কিন বাজার গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে ওয়াশিংটনেরও ব্রাজিলের খনিজ সম্পদ ও আঞ্চলিক প্রভাবের প্রয়োজন রয়েছে। তাই রাজনৈতিক মতপার্থক্য সত্ত্বেও দুই দেশের মধ্যে বাস্তববাদী সমঝোতার জায়গা থাকতে পারে।
দেশের ভেতরে কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতা
নির্বাচনে জয় পেলেও লুলার সামনে অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ কম নয়। কংগ্রেসে ডানপন্থী ও রক্ষণশীল শক্তির অবস্থান শক্তিশালী। ফলে বাজেট, করনীতি, সামাজিক কর্মসূচি কিংবা শ্রমবাজার সংস্কারের মতো বিষয়ে তাঁকে বিরোধী দল ও মধ্যপন্থী আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে সমঝোতা করতে হবে।
অর্থনীতিতেও রয়েছে চাপ। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু রাখা, সরকারি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান ধরে রাখার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা সহজ হবে না। তাঁর আগের মেয়াদে দারিদ্র্য হ্রাস ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অভিজ্ঞতা যেমন রয়েছে, তেমনি সরকারি ব্যয় ও আর্থিক শৃঙ্খলা নিয়ে বিতর্কও রয়েছে।
সব মিলিয়ে লুলার প্রত্যাবর্তন লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে, তবে এর প্রভাব নির্ভর করবে তিনি কতটা কার্যকরভাবে দেশের অভ্যন্তরীণ বিভাজন সামাল দিতে পারেন এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারেন তার ওপর।
