আফগানিস্তানে খাদ্যসংকট আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ। চলতি শীতকাল থেকে আগামী বছরের এপ্রিল পর্যন্ত দেশটির প্রায় ১ কোটি ৯২ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তার মুখে পড়তে পারে। অর্থাৎ দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৮ শতাংশের নিয়মিত খাবার জোগাড় করা কঠিন হয়ে উঠবে। পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে প্রায় ৫০ লাখ মানুষের জরুরি পর্যায়ের ক্ষুধার ঝুঁকি। তাদের জন্য দ্রুত খাদ্যসহায়তা ও কৃষি সহায়তা নিশ্চিত করা না গেলে জীবনহানি এবং জীবিকা হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।
আফগানিস্তানে খাদ্যসংকট নতুন নয়। তবে উচ্চ খাদ্যদাম, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের অভাব এবং আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। দেশটিতে বহু পরিবার আয় হারিয়েছে, আবার যাদের আয় রয়েছে, তাদের অনেকের পক্ষেও প্রয়োজনীয় খাবার কেনা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে কৃষি উৎপাদন কিছুটা ভালো হলেও সাধারণ মানুষের খাদ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত হচ্ছে না।
কেন বাড়ছে খাদ্যসংকট
আফগানিস্তানে খাদ্য অনিরাপত্তা বাড়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। প্রথমত, দেশটিতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত। অনেক পরিবার নিয়মিত আয় করতে পারছে না। দ্বিতীয়ত, খাদ্য ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাজারে পণ্য থাকলেও দরিদ্র পরিবারগুলোর পক্ষে তা কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এ ছাড়া প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে বিপুলসংখ্যক আফগান নাগরিকের ফিরে আসাও পরিস্থিতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ১২ লাখের বেশি আফগান দেশে ফিরেছেন। তাদের অনেকেরই স্থায়ী বাসস্থান, কাজ কিংবা পর্যাপ্ত খাদ্যসংস্থান নেই। ফলে আগে থেকেই সংকটে থাকা পরিবার ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের ওপর নতুন চাপ তৈরি হয়েছে।
মানবিক সহায়তার অর্থায়ন কমে যাওয়াও বড় সমস্যা। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো আগের তুলনায় কম সহায়তা দিতে পারায় খাদ্য, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী পরিবারগুলো সহায়তা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
৫০ লাখ মানুষ জরুরি ক্ষুধার ঝুঁকিতে
খাদ্যসংকটের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, প্রায় ৫০ লাখ মানুষ জরুরি পর্যায়ের ক্ষুধার মুখে পড়তে পারে। এই পর্যায়ে থাকা মানুষেরা সাধারণত খাবারের পরিমাণ ও মান দুটোই কমিয়ে দিতে বাধ্য হন। অনেক পরিবার ঋণ করে খাবার কেনে, সম্পদ বিক্রি করে কিংবা সন্তানদের প্রয়োজনীয় খাবার কমিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে।
জরুরি পর্যায়ের খাদ্য অনিরাপত্তা দীর্ঘায়িত হলে অপুষ্টি, রোগব্যাধি এবং মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে শিশু, গর্ভবতী নারী, স্তন্যদানকারী মা এবং বয়স্ক ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। পর্যাপ্ত পুষ্টি না পেলে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়ায় সাধারণ সংক্রমণও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এবার তীব্র খাদ্যসংকটে পড়তে পারে এমন মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। গত বছরের একই মৌসুমে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি ৭৪ লাখ। এবার তা বেড়ে ১ কোটি ৯২ লাখে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটেছে।
কৃষি উৎপাদন ভালো হলেও কেন স্বস্তি নেই
২০২৬ সালে অনুকূল বৃষ্টিপাতের কারণে আফগানিস্তানের কিছু অঞ্চলে কৃষি উৎপাদন ও পশুচারণের পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো ছিল। সাধারণভাবে ভালো ফসল খাদ্যসংকট কমাতে সহায়ক হওয়ার কথা। কিন্তু উৎপাদন ভালো হলেই মানুষের খাদ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত হয় না।
দেশটির বহু পরিবার কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও তাদের হাতে পর্যাপ্ত জমি, সেচব্যবস্থা কিংবা বাজারে পণ্য বিক্রির সুযোগ নেই। আবার অনেক পরিবার খাদ্য উৎপাদন না করে দৈনিক মজুরি বা ছোটখাটো কাজের ওপর নির্ভর করে। তাদের আয় না বাড়লে বাজারে খাবার থাকলেও কেনার সামর্থ্য তৈরি হয় না।
পরিবহন ব্যয় বেশি হওয়ায় প্রত্যন্ত অঞ্চলে খাদ্য পৌঁছানোও কঠিন। পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকায় শীতের সময় সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হলে বাজারে পণ্যের সরবরাহ কমে যেতে পারে। এতে খাদ্যের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা থাকে।
শিশুদের অপুষ্টি নিয়ে বাড়তি উদ্বেগ
আফগানিস্তানে খাদ্যসংকটের পাশাপাশি শিশুদের অপুষ্টি পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। আগামী ২০২৭ সালে প্রায় ৪০ লাখ নারী ও শিশুর তীব্র অপুষ্টির চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় ১০ লাখ শিশুর ক্ষেত্রে গুরুতর অপুষ্টির ঝুঁকি রয়েছে।
অপুষ্টির প্রভাব শুধু শরীরের ওজন কমে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত পুষ্টি না পেলে শিশুদের বৃদ্ধি, মস্তিষ্কের বিকাশ এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে জীবনের প্রথম কয়েক বছরে অপুষ্টি দেখা দিলে তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব থেকে যেতে পারে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় খাদ্য বিতরণের পাশাপাশি পুষ্টিকর খাবার, চিকিৎসা, বিশুদ্ধ পানি এবং স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা জরুরি। শুধু খাদ্যশস্য সরবরাহ করলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না; শিশু ও মায়েদের জন্য বিশেষ পুষ্টি কর্মসূচিও প্রয়োজন।
সহায়তা কমলে বিপর্যয় আরও গভীর হতে পারে
আফগানিস্তানে খাদ্য ও পুষ্টি কার্যক্রম চালিয়ে যেতে আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়োজন। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির জরুরি কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে ২০২৭ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ৫৪ কোটি ডলার প্রয়োজন বলে জানানো হয়েছে। কিন্তু অর্থের ঘাটতি থাকলে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের কাছে সহায়তা পৌঁছানো কঠিন হবে।
মানবিক সহায়তা কমে গেলে সংস্থাগুলোকে অনেক সময় খাদ্য বিতরণের পরিমাণ কমাতে কিংবা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দিতে হয়। এতে অন্য দরিদ্র পরিবারগুলো সহায়তার বাইরে থেকে যায়। ফলে খাদ্যসংকট ধীরে ধীরে আরও বিস্তৃত হতে পারে।
আফগানিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে, শুধু কৃষি উৎপাদন বাড়িয়ে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। মানুষের আয়, কর্মসংস্থান, বাজারে খাদ্যের দাম, পরিবহনব্যবস্থা এবং মানবিক সহায়তা—সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
আগামী এপ্রিল পর্যন্ত সময়টি দেশটির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শীতকালীন খাদ্যসংকট মোকাবিলায় দ্রুত সহায়তা পৌঁছানো না গেলে লাখ লাখ মানুষ আরও গভীর ক্ষুধা ও অপুষ্টির ঝুঁকিতে পড়বে। বিশেষ করে শিশু ও নারীদের সুরক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। অন্যথায় আফগানিস্তানের দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকট নতুন করে ভয়াবহ বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।
