দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ, রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের ইতিহাস পেছনে ফেলে তাজিকিস্তানের সঙ্গে সীমান্তে বড় ধরনের নিরাপত্তা অবকাঠামো নির্মাণ সম্পন্ন করেছে কিরগিজস্তান। দেশটির বাতকেন অঞ্চলে দুই দেশের সীমান্তের নির্দিষ্ট অংশজুড়ে প্রায় ৩২৭ দশমিক ৭ কিলোমিটার বেড়া বসানো হয়েছে। একই সঙ্গে সীমান্তরক্ষীদের চলাচল ও নজরদারি সহজ করতে তৈরি করা হয়েছে ৩৩৮ কিলোমিটারের বেশি টহল সড়ক। মধ্য এশিয়ার এই দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে কয়েক দশকের বিরোধ ও প্রাণঘাতী সংঘর্ষের পর প্রকল্পটিকে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার এবং স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২৯ অক্টোবর কিরগিজস্তানের বাতকেন অঞ্চলের প্রশাসন সীমান্তে বেড়া ও প্রকৌশল অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে। এর আগে অক্টোবরের মাঝামাঝি দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনীও কাজ শেষ হওয়ার কথা জানিয়েছিল। তবে বেড়া নির্মাণ শেষ হলেও দুই দেশের পুরো সীমান্তের চূড়ান্ত সীমানা নির্ধারণ ও ভূমিতে সীমারেখা চিহ্নিত করার কাজ এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। ফলে এই প্রকল্পকে সীমান্ত বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
কেন সীমান্তে বেড়া নির্মাণ জরুরি হয়ে উঠেছিল
কিরগিজস্তান ও তাজিকিস্তানের মধ্যে প্রায় এক হাজার ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর দুই দেশ স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হলেও তাদের সীমান্তের বেশ কিছু অংশ নিয়ে মতবিরোধ থেকে যায়। বিশেষ করে বাতকেন অঞ্চলের ঘনবসতিপূর্ণ ফারগানা উপত্যকায় গ্রাম, কৃষিজমি, সড়ক, পানির উৎস এবং যোগাযোগপথের অবস্থান নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়।
সীমান্তের কিছু অংশ এমনভাবে দুই দেশের জনবসতির কাছাকাছি চলে গেছে যে, এক গ্রামের মানুষকে অন্য দেশের ভূখণ্ডের ভেতর দিয়ে কৃষিজমি বা বাজারে যেতে হতো। কোথাও রাস্তা ব্যবহারের অধিকার, কোথাও পানির উৎস কিংবা চারণভূমি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ দেখা দিত। এসব সমস্যা ধীরে ধীরে দুই দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘাতে রূপ নেয়।
সীমান্তের সুনির্দিষ্ট অবস্থান নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে দুই দেশের বাসিন্দাদের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ত। অনেক এলাকায় সীমান্তরেখা পরিষ্কারভাবে চিহ্নিত না থাকায় সাধারণ মানুষের চলাচল, কৃষিকাজ ও বাণিজ্যও বাধাগ্রস্ত হতো। বেড়া নির্মাণের মাধ্যমে এসব এলাকায় নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি সহজ করার চেষ্টা করছে কিরগিজস্তান।
২০২১ ও ২০২২ সালের সংঘর্ষের ভয়াবহ স্মৃতি
সীমান্ত বিরোধ সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নেয় ২০২১ ও ২০২২ সালে। বিশেষ করে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ পূর্ণাঙ্গ সশস্ত্র লড়াইয়ে রূপ নেয়। ভারী অস্ত্রের ব্যবহার, গোলাবর্ষণ এবং সীমান্তবর্তী জনবসতিতে হামলার ঘটনায় দুই দেশের বহু মানুষ নিহত হন। বিভিন্ন হিসাবে নিহতের সংখ্যা একশ ছাড়িয়ে যায়।
কিরগিজস্তানের বাতকেন অঞ্চলে শত শত বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়। নিরাপত্তার কারণে এক লাখের বেশি মানুষকে ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে হয়েছিল। সীমান্তবর্তী এলাকার পরিবারগুলো দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করে। স্কুল, বাজার, কৃষিকাজ এবং স্বাভাবিক যাতায়াতও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
এরপর দুই দেশের মধ্যে সীমান্তে চলাচল ও বাণিজ্য কঠোরভাবে সীমিত হয়ে পড়ে। অনেক সীমান্ত ক্রসিং বন্ধ থাকায় স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে দীর্ঘ পথ ঘুরে চলাচল করতে হতো। ফলে রাজনৈতিক বিরোধের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষতিও বাড়তে থাকে।
২০২৫ সালের চুক্তিতে খুলেছিল সমাধানের পথ
দীর্ঘ আলোচনার পর ২০২৫ সালের ১৩ মার্চ কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে দুই দেশের প্রেসিডেন্ট সাদির জাপারভ ও ইমোমালি রাহমনের মধ্যে সীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে দীর্ঘদিনের বিরোধপূর্ণ সীমান্তের অবস্থান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ঘটে। দুই দেশের মধ্যে জমি বিনিময় ও পারস্পরিক ছাড়ের ভিত্তিতে বিরোধপূর্ণ এলাকাগুলোর সমাধানের পথ তৈরি হয়।
চুক্তির পাশাপাশি সড়ক, রেল ও আকাশপথে যোগাযোগ পুনরায় চালুর বিষয়েও সমঝোতা হয়। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা কয়েকটি সীমান্ত ক্রসিংও আবার খুলে দেওয়া হয়। এর ফলে দুই দেশের নাগরিকদের যাতায়াত এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলের বাণিজ্য পুনরুজ্জীবিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
চুক্তিটি শুধু সীমান্তের মানচিত্র নির্ধারণের বিষয় ছিল না; বরং দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক আস্থা ফিরিয়ে আনারও একটি প্রচেষ্টা। সংঘর্ষের পর যে অবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে অর্থনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগ স্বাভাবিক করাই ছিল এর অন্যতম লক্ষ্য।
৩২৭ কিলোমিটার বেড়া, সঙ্গে শত শত কিলোমিটার সড়ক
২০২৫ ও ২০২৬ সালে বাতকেন এবং লেইলেক জেলায় পর্যায়ক্রমে সীমান্তে বেড়া বসানো হয়। ২০২৫ সালে প্রায় ১৪৯ দশমিক ৬ কিলোমিটার বেড়া নির্মাণ করা হয়েছিল। ২০২৬ সালের ২ মার্চ থেকে ১৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আরও ১৭৮ দশমিক ১ কিলোমিটার বেড়া স্থাপন করা হয়। সব মিলিয়ে নির্মিত বেড়ার দৈর্ঘ্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩২৭ দশমিক ৭ কিলোমিটার।
সীমান্তরক্ষীদের চলাচল সহজ করতে একই সময়ে ৩৩৮ দশমিক ৫ কিলোমিটার টহল সড়কও তৈরি করা হয়েছে। এসব সড়কের একটি অংশ পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকায় নির্মিত হয়েছে, যেখানে আগে নিরাপত্তা বাহিনীর নিয়মিত যাতায়াত কঠিন ছিল। সমতল ভূমির পাশাপাশি উঁচু পাহাড়ি এলাকায় নির্মাণকাজ পরিচালনা করতে হয়েছে।
২০২৬ সালে নির্মিত সড়কের দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ১৬৭ দশমিক ৪ কিলোমিটার। এর আগের বছর তৈরি হয়েছিল আরও ১৭১ দশমিক ২ কিলোমিটার। সীমান্তরক্ষী বাহিনীর পাশাপাশি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা বিভাগ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং শুল্ক বিভাগের সদস্যরাও প্রকল্প বাস্তবায়নে অংশ নেন।
নতুন অবকাঠামোর মাধ্যমে সীমান্তে নজরদারি, টহল এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত বাহিনী মোতায়েনের সক্ষমতা বাড়বে বলে আশা করছে কিরগিজ কর্তৃপক্ষ।
বেড়া তৈরি হলেও সীমান্ত চিহ্নিতকরণ বাকি
এই প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা হলো, বেড়া নির্মাণ সম্পন্ন হলেও দুই দেশের পুরো সীমান্তের চূড়ান্ত চিহ্নিতকরণ এখনো চলমান। সীমান্তের বিভিন্ন স্থানে নির্দিষ্ট পিলার বা সীমানা চিহ্ন স্থাপন এবং আনুষ্ঠানিক নথিপত্র চূড়ান্ত করার কাজ বাকি রয়েছে।
দুই দেশের সীমান্তের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় এক হাজার ছয় কিলোমিটার। এর মধ্যে আগে থেকেই কিছু অংশ নির্ধারিত ছিল। সাম্প্রতিক আলোচনার মাধ্যমে বাকি বিরোধপূর্ণ অংশগুলোর অবস্থান নিয়েও সমঝোতা হয়েছে। কিন্তু কাগজে সীমান্ত নির্ধারণ এবং বাস্তবে সেই সীমারেখা চিহ্নিত করা আলাদা প্রক্রিয়া। তাই বেড়া নির্মাণ শেষ হলেও সীমান্তের সব কাজ শেষ হয়েছে—এমনটি বলা যাচ্ছে না।
এ ছাড়া সীমান্ত চুক্তির ফলে যেসব পরিবার জমি বা বাড়িঘরের মালিকানা হারিয়েছে বলে দাবি করছে, তাদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কিছু পরিবার এখনো ক্ষতিপূরণের পরিমাণ, বিকল্প জমি এবং নতুন বাড়ি বরাদ্দ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করছে। ফলে সীমান্ত বিরোধের রাজনৈতিক সমাধান হলেও স্থানীয় মানুষের সব সমস্যা এখনো মেটেনি।
শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে কতটা এগোল দুই দেশ
কিরগিজস্তান ও তাজিকিস্তানের সীমান্তে বেড়া নির্মাণের কাজ শেষ হওয়া দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তবে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা শুধু অবকাঠামো নির্মাণের ওপর নির্ভর করবে না। সীমান্তবর্তী মানুষের জমি, পানি, যাতায়াত, ব্যবসা ও বসবাসের অধিকার নিশ্চিত করাও জরুরি।
দুই দেশের সরকার যদি চুক্তি বাস্তবায়ন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়াতে পারে, তাহলে অতীতের সংঘাতের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো সহজ হবে। অন্যদিকে স্থানীয় মানুষের অসন্তোষ ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় অস্পষ্টতা থেকে গেলে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।
তাই ৩২৭ কিলোমিটার বেড়া নির্মাণকে কেবল নিরাপত্তা প্রকল্প হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘদিনের বিরোধের পর আস্থা পুনর্গঠনের একটি ধাপ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। এখন দুই দেশের সামনে সবচেয়ে বড় কাজ হলো সীমান্ত চিহ্নিতকরণ শেষ করা এবং চুক্তির সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে পৌঁছে দেওয়া।
