ফিলিপাইনের অন্যতম সক্রিয় আগ্নেয়গিরি মায়নে মাঝারি মাত্রার বিস্ফোরণ ঘটার পর আশপাশের জনপদে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অগ্ন্যুৎপাতের সময় আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ থেকে ধূসর ছাইয়ের বিশাল মেঘ প্রায় তিন হাজার মিটার উঁচুতে উঠে যায়। পরিস্থিতির অবনতি বিবেচনায় সতর্কতার মাত্রা দুই থেকে বাড়িয়ে তিন করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ ছয় কিলোমিটার ব্যাসার্ধের স্থায়ী বিপজ্জনক এলাকা থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসতে পারে এমন উত্তপ্ত গ্যাস, ছাই, পাথর ও লাভার প্রবাহের বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।
৩০ অক্টোবর স্থানীয় সময় সকাল ১১টা ৫৩ মিনিটে আলবে প্রদেশের মায়ন আগ্নেয়গিরিতে বিস্ফোরণ শুরু হয়। অল্প সময়ের মধ্যে জ্বালামুখ থেকে ঘন ছাইয়ের মেঘ তৈরি হয়ে পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে ছড়িয়ে পড়ে। আশপাশের কয়েকটি এলাকায় ছাই পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। বিশেষ করে গুইনোবাতান, দারাগা ও কামালিগসহ আগ্নেয়গিরির কাছাকাছি জনপদগুলোকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। বিস্ফোরণের পর স্থানীয় প্রশাসন স্কুলের কার্যক্রম স্থগিত করে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় চলাচল সীমিত করার উদ্যোগ নেয়।
কেন সতর্কতার মাত্রা বাড়ানো হলো
ফিলিপাইনের আগ্নেয়গিরি পর্যবেক্ষণ কর্তৃপক্ষের সতর্কতার মাত্রা তিনে উন্নীত করার অর্থ হলো, মায়নে এখন এমন অবস্থায় রয়েছে যেখানে বিপজ্জনক অগ্ন্যুৎপাতের আশঙ্কা বেড়েছে। আগ্নেয়গিরির ভেতরে ম্যাগমা জ্বালামুখের কাছাকাছি অবস্থান করছে। ভূকম্পন, আগ্নেয়গিরির কম্পন, সালফার ডাই-অক্সাইড নির্গমন, পাথর গড়িয়ে পড়া এবং জ্বালামুখ থেকে বাষ্প বের হওয়ার মতো লক্ষণও পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগ্নেয়গিরির ভেতরে ম্যাগমার চাপ বাড়তে থাকলে নতুন বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। এর ফলে শুধু ছাই ছড়িয়ে পড়াই নয়, পাহাড়ের ঢাল বেয়ে অত্যন্ত উত্তপ্ত গ্যাস, ছাই ও পাথরের দ্রুতগতির প্রবাহ নেমে আসতে পারে। এই প্রবাহকে পাইরোক্লাস্টিক ডেনসিটি কারেন্ট বলা হয়। এর তাপমাত্রা ও গতি এত বেশি হতে পারে যে, পথে থাকা মানুষ, বাড়িঘর, গাছপালা ও অবকাঠামো মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
এ কারণে ছয় কিলোমিটার ব্যাসার্ধের স্থায়ী বিপজ্জনক অঞ্চল খালি রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষ বলেছে, জ্বালামুখের আশপাশে অবস্থান করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপ আরও বাড়লে বিপজ্জনক এলাকার পরিধি সম্প্রসারণের প্রয়োজন হতে পারে।
নতুন অগ্ন্যুৎপাতের পরও থামেনি আগ্নেয় তৎপরতা
৩০ অক্টোবরের বিস্ফোরণের পর মায়নের কার্যকলাপ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ২ নভেম্বর ভোরে আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখে স্বল্পস্থায়ী স্ট্রম্বোলিয়ান ধরনের অগ্ন্যুৎপাত দেখা যায়। এই ধরনের অগ্ন্যুৎপাতে জ্বালামুখ থেকে গ্যাস ও গলিত শিলার ছোট ছোট বিস্ফোরণ ঘটে। ঘটনাটি প্রায় ৪১ থেকে ৫২ সেকেন্ড স্থায়ী হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এই স্বল্পস্থায়ী কার্যকলাপকে বড় ধরনের লাভা উদ্গিরণের সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়। তবে আগ্নেয়গিরির ভেতরে ম্যাগমা সক্রিয় থাকার কারণে আরও বড় বিস্ফোরণের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তাই সতর্কতার মাত্রা তিনেই রাখা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের হিসাবে, নিষিদ্ধ বা সীমিত প্রবেশাধিকার থাকা এলাকায় এখনো প্রায় দুই হাজার মানুষ অবস্থান করছেন। স্থানীয় প্রশাসন তাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে অনেক বাসিন্দা ঘরবাড়ি, গবাদিপশু ও জীবিকার কারণে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ছাড়তে অনিচ্ছুক। ফলে উদ্ধার ও সরিয়ে নেওয়ার কাজেও চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে।
ছাই, লাভা ও কাদার স্রোতে কী ধরনের বিপদ
আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের সময় ছাইয়ের মেঘ বাতাসের সঙ্গে বহু দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে। ছাইয়ের সূক্ষ্ম কণা মানুষের শ্বাসতন্ত্রে প্রবেশ করে কাশি, শ্বাসকষ্ট ও চোখের জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করতে পারে। শিশু, বয়স্ক এবং শ্বাসকষ্টে ভোগা ব্যক্তিরা এ ক্ষেত্রে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। ছাই জমে বাড়ির ছাদ ভারী হয়ে পড়তে পারে, পানির উৎস দূষিত করতে পারে এবং কৃষিজমির ক্ষতি করতে পারে।
আরেকটি বড় ঝুঁকি হলো লাভা ও উত্তপ্ত গ্যাসের প্রবাহ। মায়নের ঢাল বেয়ে গলিত শিলা নেমে এলে আশপাশের বসতি ও কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অগ্ন্যুৎপাতের পর বৃষ্টিপাত হলে ছাই ও আগ্নেয় পদার্থ মিশে কাদার স্রোত তৈরি করতে পারে, যা নদীখাত ধরে দ্রুত নিচের জনপদে পৌঁছে যায়। এ ধরনের স্রোতকে লাহার বলা হয়। আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপ কমে যাওয়ার পরও লাহারের ঝুঁকি থেকে যেতে পারে।
বিমান চলাচলের ক্ষেত্রেও ছাইয়ের মেঘ বিপজ্জনক। বিমানের ইঞ্জিনে আগ্নেয় ছাই প্রবেশ করলে ইঞ্জিনের কার্যক্ষমতা ব্যাহত হতে পারে। এ কারণে মায়নের জ্বালামুখের কাছাকাছি আকাশপথ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ফিলিপাইন কেন এত আগ্নেয়গিরিপ্রবণ
ফিলিপাইন প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’-এর অংশ। এই বিস্তৃত অঞ্চলে ভূত্বকের একাধিক টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষ ও চলাচলের কারণে ভূমিকম্প এবং আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ঘন ঘন ঘটে। দেশটিতে দুই ডজনের বেশি সক্রিয় আগ্নেয়গিরি রয়েছে। এর মধ্যে মায়ন তার প্রায় নিখুঁত শঙ্কু আকৃতির জন্য পরিচিত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা প্রায় দুই হাজার ৪৬৩ মিটার।
মায়ন আগ্নেয়গিরির অতীতও বেশ ভয়াবহ। এর অগ্ন্যুৎপাতের কারণে বহুবার আশপাশের জনপদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০১৮ সালেও দীর্ঘস্থায়ী অগ্ন্যুৎপাতের কারণে হাজার হাজার মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে হয়েছিল। চলতি বছরের আগস্টে সতর্কতার মাত্রা কমানো হলেও আগ্নেয়গিরির ভেতরের অস্থিরতা পুরোপুরি শেষ হয়নি।
বাসিন্দাদের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি কী
বর্তমান পরিস্থিতিতে স্থানীয় প্রশাসন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রধান লক্ষ্য হলো প্রাণহানি ঠেকানো। বিপজ্জনক এলাকার বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া, আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা এবং ছাই পড়তে পারে এমন এলাকায় মানুষকে প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বাইরে বের হলে মাস্ক ও চোখের সুরক্ষার ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
মায়নের অগ্ন্যুৎপাত কতটা ভয়াবহ হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে ম্যাগমা জ্বালামুখের কাছে থাকায় পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে। সতর্কতার মাত্রা তিনে উন্নীত হওয়া তাই শুধু প্রশাসনিক ঘোষণা নয়, বরং আশপাশের মানুষের জন্য বড় বিপদের পূর্বসংকেত। আগামী কয়েক দিন আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপের ওপর নজরদারি এবং নির্দেশনা মেনে চলাই প্রাণহানি ঠেকানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
