জন্মহার কমে যাওয়ায় ভবিষ্যৎ জনসংখ্যা, কর্মক্ষম শ্রমশক্তি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে ভিয়েতনামে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সন্তান জন্মদানে উৎসাহ দিতে নগদ অর্থ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজধানী হ্যানয়ের কর্তৃপক্ষ। ২০২৭ সাল থেকে ৩৫ বছর বয়সের আগে দুই সন্তানের মা হলে একজন নারীকে এককালীন চার মিলিয়ন ভিয়েতনামি ডং, অর্থাৎ প্রায় ১৫৪ ডলার দেওয়া হবে। পাশাপাশি বিয়ের আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পরামর্শ নেওয়া দম্পতিদের জন্যও আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, কয়েকশ ডলারের এই প্রণোদনা কি সত্যিই তরুণ দম্পতিদের সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত বদলাতে পারবে, নাকি ভিয়েতনামের জন্মহার সংকটের পেছনে থাকা গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো অমীমাংসিতই থেকে যাবে?
ভিয়েতনামের জনসংখ্যা নীতিতে দীর্ঘদিন ধরে দুই সন্তান নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। একসময় জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি কমাতে পরিবার পরিকল্পনার ওপর জোর দেওয়া হলেও এখন পরিস্থিতি উল্টো দিকে মোড় নিয়েছে। দেশটির মোট প্রজনন হার বা একজন নারীর জীবদ্দশায় গড়ে সন্তান জন্মদানের সংখ্যা প্রতিস্থাপন পর্যায়ের নিচে নেমে গেছে। জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে সাধারণত এই হার প্রায় ২ দশমিক ১ হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু ভিয়েতনামে ২০২৪ সালে তা নেমে আসে ১ দশমিক ৯১-এ। ২০২৫ সালে সামান্য বেড়ে ১ দশমিক ৯৩ হলেও দীর্ঘমেয়াদি নিম্নমুখী প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে।
হ্যানয়ের নতুন আর্থিক প্রণোদনা
হ্যানয়ের নগর কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত নতুন নীতিতে ৩৫ বছর বয়সের আগে দুই সন্তানের জন্ম দেওয়া নারীদের এককালীন চার মিলিয়ন ডং দেওয়া হবে। সুবিধা পেতে সংশ্লিষ্ট নারীকে রাজধানীর স্থায়ী বা অস্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে অন্তত ছয় মাস নিবন্ধিত থাকতে হবে। বয়স গণনা করা হবে সন্তান জন্মের সময়, জন্ম নিবন্ধনের সময় নয়।
এ ছাড়া বিয়ের পরিকল্পনা করা দম্পতিরা নির্ধারিত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বিয়ের আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পরামর্শ নিলে এক মিলিয়ন ডং সহায়তা পাবেন। দুই সন্তান নেওয়ার লক্ষ্য ধরে রাখতে সক্ষম স্থানীয় প্রশাসনিক এলাকাগুলোকেও আর্থিক পুরস্কার দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কোনো কমিউন বা ওয়ার্ড টানা তিন বছর নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা বজায় রাখতে পারলে ৩০ মিলিয়ন ডং এবং পাঁচ বছর ধরে রাখতে পারলে ৬০ মিলিয়ন ডং পুরস্কার পেতে পারে।
২০২৭ সাল থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই কর্মসূচির আওতায় বছরে আনুমানিক ১৫ হাজার নারী অর্থসহায়তা পেতে পারেন। এর জন্য বছরে প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডং ব্যয় হতে পারে। কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, এই অর্থ সন্তান লালন-পালনের সম্পূর্ণ ব্যয় বহন করার জন্য নয়; বরং পরিবারগুলোর ওপর থাকা আর্থিক চাপ কিছুটা কমানোর উদ্যোগ।
কেন সন্তান নিতে চাইছেন না তরুণ দম্পতিরা
ভিয়েতনামের জন্মহার কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। রাজধানী হ্যানয় ও হো চি মিন সিটির মতো বড় নগরীতে বাড়িভাড়া, শিশুর পরিচর্যা, শিক্ষা ও চিকিৎসার খরচ দ্রুত বেড়েছে। তরুণদের একটি বড় অংশের কাছে নিজের বাড়ি কেনা কিংবা দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে বিয়ে ও সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিচ্ছেন অনেকে।
চাকরির চাপও গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণ। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, প্রতিযোগিতামূলক চাকরির বাজার এবং কর্মজীবী নারীদের ওপর ঘর ও সন্তানের দায়িত্বের অসম বণ্টন পরিবার পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলছে। অনেক দম্পতি মনে করেন, সন্তান নেওয়ার অর্থ শুধু জন্মের সময়ের খরচ নয়; বরং পরবর্তী দুই দশক ধরে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান ও পরিচর্যার বড় দায়িত্ব বহন করা।
বিয়ের বয়সও বাড়ছে। ২০১৯ সালে ভিয়েতনামে প্রথম বিয়ের গড় বয়স ছিল প্রায় ২৫ দশমিক ২ বছর, যা ২০২৪ সালে বেড়ে ২৭ দশমিক ৩ বছরে পৌঁছেছে। বিয়ে দেরিতে হলে সন্তান নেওয়ার সময়ও কমে আসে। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে বয়স বাড়ার সঙ্গে সন্তান ধারণের সম্ভাবনা কমতে পারে। ফলে দেরিতে বিয়ে ও কম সন্তান নেওয়ার প্রবণতা একে অন্যকে প্রভাবিত করছে।
জন্মহার কমলে কী ধরনের সংকট তৈরি হবে
জন্মহার দীর্ঘদিন কম থাকলে দেশের জনসংখ্যার বয়স কাঠামো বদলে যায়। কর্মক্ষম তরুণের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে যায়, অন্যদিকে প্রবীণ মানুষের অনুপাত বাড়তে থাকে। এতে পেনশন, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ে। একই সঙ্গে শিল্প, কৃষি, নির্মাণ ও সেবা খাতে প্রয়োজনীয় শ্রমিক পাওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
ভিয়েতনাম গত কয়েক দশকে দ্রুত শিল্পায়ন ও রপ্তানিমুখী অর্থনীতির মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। দেশটির উৎপাদন খাতে বিপুলসংখ্যক কর্মীর প্রয়োজন হয়। ভবিষ্যতে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী কমে গেলে উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে শ্রমশক্তির প্রাপ্যতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।
জনসংখ্যা দ্রুত বয়স্ক হয়ে পড়লে পরিবারগুলোর ওপরও চাপ বাড়বে। কম সন্তান থাকা পরিবারে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দেখাশোনার দায়িত্ব অল্পসংখ্যক সন্তানের ওপর পড়বে। এতে কর্মজীবী মানুষের সময় ও অর্থের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।
নগদ প্রণোদনা কি সিদ্ধান্ত বদলাতে পারবে
জন্মহার বাড়াতে নগদ অর্থ দেওয়ার নীতি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যবহার করা হয়েছে। কোথাও সন্তান জন্মের পর এককালীন অর্থ দেওয়া হয়, কোথাও মাসিক ভাতা, কর ছাড়, শিশুযত্নের খরচে সহায়তা কিংবা দীর্ঘমেয়াদি মাতৃত্ব ও পিতৃত্বকালীন ছুটি দেওয়া হয়। কিন্তু শুধু নগদ অর্থ দিয়ে জন্মহার স্থায়ীভাবে বাড়ানো কঠিন—এমন অভিজ্ঞতাও রয়েছে।
হ্যানয়ের চার মিলিয়ন ডংয়ের সহায়তা একটি পরিবারের দীর্ঘমেয়াদি সন্তান লালন-পালনের ব্যয়ের তুলনায় খুবই সীমিত। ফলে এটি কিছু পরিবারের জন্য প্রাথমিক উৎসাহ তৈরি করতে পারে, কিন্তু বাড়িভাড়া, শিক্ষা ও পরিচর্যার ব্যয় কমাতে না পারলে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা কঠিন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নগদ প্রণোদনার পাশাপাশি কর্মজীবী মা-বাবার জন্য সাশ্রয়ী শিশুযত্নকেন্দ্র, মানসম্মত সরকারি শিক্ষা, মাতৃত্ব ও পিতৃত্বকালীন ছুটি, কর্মক্ষেত্রে নমনীয় সময়সূচি এবং আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সন্তান জন্মের পর নারীরা যেন চাকরি হারানোর ভয় না পান, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
হ্যানয়ের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ছে উদ্বেগ
জন্মহার কমার সমস্যা শুধু হ্যানয়ে সীমাবদ্ধ নয়। হো চি মিন সিটি এবং আরও কয়েকটি প্রদেশ ও নগরীতে প্রজনন হার জাতীয় গড়ের নিচে রয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলের বড় শহরগুলোতে আগে থেকেই সন্তান জন্মদানের হার কম। এখন দেশের অন্য এলাকাতেও একই প্রবণতা ছড়িয়ে পড়ছে বলে উদ্বেগ রয়েছে।
হো চি মিন সিটিতে দ্বিতীয় সন্তান নেওয়া নারীদের জন্য আগেই আর্থিক সহায়তা চালু করা হয়েছিল। নতুন করে হ্যানয়ের উদ্যোগ দেখাচ্ছে, স্থানীয় প্রশাসনগুলো জন্মহার বাড়াতে আরও সক্রিয় হচ্ছে। তবে নগরভিত্তিক উদ্যোগের পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত নীতি না থাকলে ফল সীমিত হতে পারে।
ভিয়েতনামের সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ—একদিকে তরুণ পরিবারকে সন্তান নিতে উৎসাহিত করা, অন্যদিকে বাড়তে থাকা প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। নগদ অর্থের প্রণোদনা এই সংকট মোকাবিলার একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ হতে পারে। কিন্তু তরুণদের কাছে পরিবার গঠনকে বাস্তবসম্মত ও আর্থিকভাবে নিরাপদ করে তুলতে না পারলে শুধু অর্থের বিনিময়ে জন্মহার বাড়ানো সম্ভব হবে না।vietnamnews.vn+3
