যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছেন ডেমোক্র্যাট নেতা আবদুল এল-সায়েদ। মিশিগান অঙ্গরাজ্যের সিনেট নির্বাচনে জয়ী হয়ে দেশটির ইতিহাসে প্রথম মুসলিম হিসেবে মার্কিন সিনেটে নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে তার এই জয় শুধু ডেমোক্র্যাটদের জন্য রাজনৈতিক সাফল্য নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভায় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় আড়াইশ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ ও জাতিগত পরিচয়ের মানুষ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। মুসলিম জনপ্রতিনিধিরাও প্রতিনিধি পরিষদসহ বিভিন্ন পর্যায়ে নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু দেশের জাতীয় আইনসভার উচ্চকক্ষ সিনেটে এর আগে কোনো মুসলিম নির্বাচিত হতে পারেননি। আবদুল এল-সায়েদের বিজয়ের মধ্য দিয়ে সেই দীর্ঘ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পরিবর্তন এলো।
মিশিগানের এই নির্বাচনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন রিপাবলিকান প্রার্থী ও সাবেক কংগ্রেস সদস্য মাইক রজার্স। নির্বাচনী প্রচারণার শেষ পর্যায়ে দুই প্রার্থীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেশ আলোচিত হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত ভোটের ফলাফলে এল-সায়েদের জয় নিশ্চিত হয়।
কে এই আবদুল এল-সায়েদ?
৪২ বছর বয়সী আবদুল এল-সায়েদ পেশায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। রাজনীতিতে আসার আগে তিনি জনস্বাস্থ্য প্রশাসন ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মিশিগানের জনস্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। জনস্বাস্থ্য, স্বাস্থ্যসেবায় সমতা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের বিষয়গুলো তার রাজনৈতিক চিন্তাভাবনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মিশিগানের ডেট্রয়েট শহরে জন্ম নেওয়া এল-সায়েদের পারিবারিক শিকড় মিসরে। তার এই পরিচয় যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক ও অভিবাসী সমাজের একটি প্রতিনিধিত্বশীল চিত্রও তুলে ধরে।
২০১৮ সালে মিশিগানের গভর্নর নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রাথমিক নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি জাতীয় পর্যায়ে আলোচনায় আসেন। যদিও সে সময় দলীয় মনোনয়ন পাননি, তবে তার প্রচারণা তরুণ ভোটার ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে সাড়া ফেলেছিল।
এরপর দীর্ঘ সময় ধরে স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থায় করপোরেট প্রভাব কমানোর মতো বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন তিনি। ২০২৬ সালের সিনেট নির্বাচনে তার প্রচারণার কেন্দ্রেও এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
স্বাস্থ্যসেবা ও সাধারণ মানুষের ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি
নির্বাচনী প্রচারণায় এল-সায়েদ সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন সাধারণ পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর ওপর। তার বক্তব্যে স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন, কর্মজীবী মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা এবং বড় করপোরেশনগুলোর রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়গুলো বারবার উঠে এসেছে।
তিনি যুক্তরাষ্ট্রে সবার জন্য সরকারি অর্থায়নে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তার সমর্থিত মেডিকেয়ার ফর অল কর্মসূচির লক্ষ্য হলো নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার বাড়ানো এবং চিকিৎসার ব্যয় কমানো।
যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসা ব্যয় দীর্ঘদিন ধরেই সাধারণ মানুষের উদ্বেগের বিষয়। অনেক পরিবার স্বাস্থ্যবিমা থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসার জন্য উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় করে। ফলে স্বাস্থ্যসেবাকে নাগরিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবি তার নির্বাচনী প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন তৈরি করেছে।
নির্বাচনী প্রচারণায় ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে বিতর্ক
এল-সায়েদের নির্বাচনী যাত্রা অবশ্য পুরোপুরি বিতর্কমুক্ত ছিল না। তার মুসলিম পরিচয়, মধ্যপ্রাচ্যনীতি এবং ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত নিয়ে অবস্থানকে কেন্দ্র করে প্রচারণার সময় বিভিন্ন বিতর্ক তৈরি হয়।
রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী মাইক রজার্স তার বিরুদ্ধে মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগ তুলে রাজনৈতিক আক্রমণ চালিয়েছিলেন। এল-সায়েদ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন। অভিযোগগুলোর পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণও সামনে আসেনি।
অন্যদিকে, গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়ে এল-সায়েদের কঠোর অবস্থান এবং ইসরায়েলকে মার্কিন সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিরোধিতা নির্বাচনী বিতর্কে জায়গা করে নেয়। বিশেষ করে মিশিগানের ইহুদি ভোটারদের একটি অংশের মধ্যে তার অবস্থান নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছিল।
তবে নির্বাচনের ফলাফল দেখিয়েছে, ধর্মীয় পরিচয় ও পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি ভোটারদের কাছে অর্থনীতি, স্বাস্থ্যসেবা এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
মুসলিম আমেরিকানদের প্রতিনিধিত্বে নতুন মাইলফলক
যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ও সামাজিক উপস্থিতি গত কয়েক দশকে বেড়েছে। দেশটির বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে মুসলিম জনপ্রতিনিধি, মেয়র, আইনপ্রণেতা এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করছেন। ইলহান ওমর ও রাশিদা তালাইবের মতো মুসলিম নারী প্রতিনিধি পরিষদে নির্বাচিত হয়ে আগেই ইতিহাস তৈরি করেছেন।
কিন্তু সিনেটের প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে এবারই প্রথম কোনো মুসলিম নির্বাচিত হলেন। ফলে এল-সায়েদের বিজয় মুসলিম আমেরিকানদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
এটি যুক্তরাষ্ট্রের বহুত্ববাদী রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিত্বের বিষয়টিও সামনে এনেছে। বিশেষ করে অভিবাসী পরিবার থেকে উঠে আসা নাগরিকদের জন্য জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতিতে অংশগ্রহণের সম্ভাবনা আরও দৃশ্যমান হয়েছে।
ট্রাম্পের নির্বাচনী বিপর্যয়ের মধ্যেই এল-সায়েদের জয়
এল-সায়েদের বিজয় এমন এক নির্বাচনে এসেছে, যেখানে ডেমোক্র্যাটরা রিপাবলিকানদের কাছ থেকে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নেওয়ার পথে এগিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের জনপ্রিয়তা হ্রাস, অর্থনৈতিক অসন্তোষ এবং ইরান যুদ্ধের প্রভাব নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
মিশিগানে এল-সায়েদের জয় ডেমোক্র্যাটদের সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পথেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অবসর নিতে যাওয়া ডেমোক্র্যাট সিনেটর গ্যারি পিটার্সের আসনটি ধরে রাখতে পেরে দলটি রিপাবলিকানদের সম্ভাব্য অগ্রগতি ঠেকিয়েছে।
এখন সিনেটে দায়িত্ব নেওয়ার পর এল-সায়েদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হবে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টা করা। স্বাস্থ্যসেবা সংস্কার, অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো, করপোরেট প্রভাব নিয়ন্ত্রণ এবং পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তনের মতো বিষয় নিয়ে তাকে কাজ করতে হবে।
সব মিলিয়ে আবদুল এল-সায়েদের বিজয় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। এটি শুধু একজন মুসলিম রাজনীতিকের সিনেটে প্রবেশ নয়, বরং দেশটির জাতীয় প্রতিনিধিত্বের কাঠামোয় নতুন পরিচয় ও অভিজ্ঞতার সংযোজন। তার এই জয় আগামী দিনে মুসলিম আমেরিকানদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণে কতটা প্রভাব ফেলে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
