যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আগামী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হলে কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেবেন, সে বিষয়ে নিজের পরিকল্পনার কথা প্রকাশ করেছেন তিনি। ট্রাম্পের ঘোষণা, বিরোধী দল কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিলে তিনি হয়ে উঠবেন ‘মি. ভেটো’। অর্থাৎ ডেমোক্র্যাটদের পাঠানো আইনপ্রস্তাব একের পর এক আটকে দেবেন তিনি।
ট্রাম্পের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বেশ উত্তপ্ত। প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই দলের মধ্যে চলছে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা। বিশেষ করে প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা বাড়ছে।
সম্প্রতি নিউইয়র্ক পোস্টের সাংবাদিক মিরান্ডা ডিভাইনের পডকাস্টে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পকে প্রশ্ন করা হয়, ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলে তিনি কীভাবে কাজ করবেন। জবাবে তিনি বলেন, তাঁর হয়তো ‘মি. ভেটো’ হয়ে ওঠা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।
ডেমোক্র্যাটদের প্রস্তাবে একের পর এক ভেটো
সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের বক্তব্য ছিল বেশ স্পষ্ট। ডেমোক্র্যাটরা যদি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নেয়, তাহলে তাদের পাঠানো আইনপ্রস্তাবগুলোতে তিনি ভেটো প্রয়োগ করবেন।
তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বিরোধী দলের সদস্যরা বিভিন্ন বিল পাস করে প্রেসিডেন্টের কাছে পাঠাবেন। তিনি সেগুলোতে ভেটো দেবেন। এভাবে এক বা দুই মাস ধরে প্রস্তাব আটকে থাকলে ডেমোক্র্যাটরা শেষ পর্যন্ত আলোচনায় বসতে বাধ্য হবে বলে মনে করেন তিনি।
ট্রাম্পের ধারণা, একপর্যায়ে বিরোধী দল বুঝতে পারবে যে এভাবে সময় নষ্ট করে লাভ নেই। তখন তারা সমঝোতার জন্য হোয়াইট হাউসের সঙ্গে আলোচনা শুরু করবে।
তিনি বলেন, শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষের মধ্যে চুক্তি হতে পারে। অতীতেও এমন পরিস্থিতিতে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে।
তবে ট্রাম্প একই সঙ্গে জানিয়েছেন, তিনি চান না এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হোক। রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে তাঁকে এ ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে না।
মধ্যবর্তী নির্বাচন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে ৩ নভেম্বর। এই নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের সব ৪৩৫টি আসন এবং সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে ৩৫টির জন্য ভোট হবে।
বর্তমানে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট উভয় কক্ষেই রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। ফলে আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন এবং প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে ট্রাম্প প্রশাসন নিজ দলের সমর্থন পাচ্ছে।
কিন্তু নির্বাচনের পর এই পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ অথবা সিনেটের যেকোনো একটির নিয়ন্ত্রণ পেলেই হোয়াইট হাউসের সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক সংঘাতের নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে।
বিশেষ করে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হারালে রিপাবলিকানদের জন্য প্রশাসনের নীতিগত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে উঠবে। বাজেট, সরকারি ব্যয় এবং বিভিন্ন আইনপ্রস্তাব নিয়ে বিরোধ বাড়তে পারে।
অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত ও শুনানির সুযোগও পাবে। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কংগ্রেসে হাজির হতে হতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ নথি ও যোগাযোগের তথ্য চাওয়ার ক্ষমতাও তাদের হাতে থাকবে।
ভেটো ক্ষমতা কতটা কার্যকর?
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট কংগ্রেসে পাস হওয়া কোনো বিলের বিরুদ্ধে ভেটো দিতে পারেন। এর মাধ্যমে তিনি বিলটিকে আইনে পরিণত হওয়া থেকে আটকে দিতে পারেন।
তবে প্রেসিডেন্টের ভেটোই কোনো বিলের চূড়ান্ত পরিণতি নির্ধারণ করে না। প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য সমর্থন দিলে কংগ্রেস প্রেসিডেন্টের ভেটো অতিক্রম করতে পারে।
অর্থাৎ ডেমোক্র্যাটরা শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেই ট্রাম্পের ভেটো বাতিল করতে পারবে না। এর জন্য উভয় কক্ষেই প্রয়োজন হবে আরও বড় ধরনের সমর্থন।
এ কারণেই কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালেও ভেটো ক্ষমতাকে নিজের হাতে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে দেখছেন ট্রাম্প।
তবে ঘন ঘন ভেটো প্রয়োগ করলে আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বাজেট, সরকারি কর্মসূচি ও বিভিন্ন নীতিগত উদ্যোগ নিয়ে অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
ট্রাম্পের ভেটো ব্যবহারের অতীত রেকর্ড
প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের ভেটো প্রয়োগের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাঁর প্রথম মেয়াদে তিনি মোট ১০টি বিলে ভেটো দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় মেয়াদে এখন পর্যন্ত দুটি বিলে ভেটো প্রয়োগ করেছেন।
তবে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণাধীন কংগ্রেসের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত তৈরি হলে এবার ভেটোর ব্যবহার আরও বাড়তে পারে বলে তাঁর বক্তব্য থেকে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বিরোধী দলের নিয়ন্ত্রণাধীন কংগ্রেসের সংঘাত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আইন পাস, সরকারি অর্থায়ন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা ও দর-কষাকষি করতে হয়েছে।
ট্রাম্পও সেই অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে জানিয়েছেন, শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষকে সমঝোতায় আসতে হতে পারে।
হোয়াইট হাউসের সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলে ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে শুধু ভেটো প্রয়োগের প্রশ্নই থাকবে না। প্রশাসনিক নীতি বাস্তবায়ন, সরকারি ব্যয় এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ নিয়েও জটিলতা তৈরি হতে পারে।
কংগ্রেসের তদন্ত কার্যক্রমের মুখোমুখি হতে হবে হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের। বিভিন্ন নীতির পক্ষে প্রশাসনকে আরও বেশি ব্যাখ্যা দিতে হতে পারে।
এদিকে, ট্রাম্পের প্রশাসন কংগ্রেসে বিরোধী দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা তৈরি হলে নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে কীভাবে নীতিগত কাজ চালিয়ে যাওয়া যায়, তা নিয়েও প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। শুল্ক, অভিবাসন, আবাসন ও সরকারি ব্যয়ের মতো ক্ষেত্রগুলোতে প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
অবশ্য নির্বাহী আদেশ বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও আইনি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আদালতে এসব সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করা হলে সেগুলোর বৈধতা নিয়ে বিচারিক পর্যালোচনা হতে পারে।
তৃতীয় মেয়াদ নিয়েও মন্তব্য
সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প আবারও প্রেসিডেন্ট হিসেবে তৃতীয় মেয়াদে দায়িত্ব পালনের ইচ্ছার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, সুযোগ থাকলে আবারও নির্বাচনে অংশ নিতে চাইতেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ২২তম সংশোধনী অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি দুইবারের বেশি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারেন না।
এদিকে, নির্বাচনের ফলাফল কী হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা থাকলেও সিনেটের চিত্র তুলনামূলকভাবে অনিশ্চিত।
সব মিলিয়ে, ৩ নভেম্বরের নির্বাচন ট্রাম্প প্রশাসনের বাকি মেয়াদের রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রিপাবলিকানরা নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে, নাকি ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসে শক্ত অবস্থান তৈরি করবে, তার ওপর নির্ভর করবে আগামী দিনের আইন প্রণয়ন ও প্রশাসনিক কার্যক্রম। তবে নির্বাচনের ফল যাই হোক, ‘মি. ভেটো’ হওয়ার ট্রাম্পের ঘোষণা ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক সংঘাতের সম্ভাবনাকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।
