যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় জনবসতিপূর্ণ এলাকায় আকাশ থেকে মিসাইলের মতো আছড়ে পড়েছে একটি প্রাইভেট বিমান। মাটিতে আঘাত করার সঙ্গে সঙ্গেই ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও আগুনের গোলা তৈরি হয়। মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে বিমানের ধ্বংসাবশেষ। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় বিমানে থাকা নয়জনের সবাই নিহত হয়েছেন। বিমানটি যেখানে বিধ্বস্ত হয়েছে, তার আশপাশে ছিল বাড়িঘর, গাড়ি ও মানুষের বসতি। ফলে বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা তৈরি হলেও এখন পর্যন্ত মাটিতে থাকা কারও মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি।
রোববার (১ নভেম্বর) স্থানীয় সময় দুপুরে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের পাম বিচ কাউন্টিতে এই দুর্ঘটনা ঘটে। বিমানটি টেক্সাস থেকে বাহামাসের উদ্দেশে যাচ্ছিল। দুর্ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থলে ছুটে আসে উদ্ধারকারী দল, দমকল বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। তবে বিমানের আরোহীদের কাউকেই জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
আকাশ থেকে দ্রুত নিচে নামছিল বিমানটি
দুর্ঘটনাকবলিত বিমানটি ছিল লিয়ারজেট ৬০ মডেলের একটি ব্যবসায়িক উড়োজাহাজ। এটি টেক্সাসের অস্টিন-বার্গস্ট্রম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়ন করে বাহামাসের নর্থ এলিউথেরা বিমানবন্দরের দিকে যাচ্ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় দুপুর প্রায় ১২টা ৫০ মিনিটে বিমানটি পাম বিচ কাউন্টির একটি আবাসিক এলাকায় বিধ্বস্ত হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, বিমানটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে মাটির দিকে নেমে আসছে। এরপর রাস্তার পাশে আছড়ে পড়ে এবং সঙ্গে সঙ্গেই ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। আকাশে উঠে যায় আগুন ও কালো ধোঁয়ার বিশাল কুণ্ডলী।
ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডিস্যান্টিস ঘটনাস্থলের কাছাকাছি সাংবাদিকদের বলেন, বিমানটি দেখে মনে হয়েছে যেন একটি মিসাইল আকাশ থেকে নিচে নেমে আসছে। আঘাতের পর রাস্তার পাশে বিশাল গর্ত তৈরি হয়েছে এবং চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে ধ্বংসাবশেষ।
তিনি ঘটনাটিকে অত্যন্ত ভয়াবহ বিপর্যয় হিসেবে বর্ণনা করেন।
বিধ্বস্ত হওয়ার আগে ককপিটে আতঙ্কের বার্তা
দুর্ঘটনার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, বিমানটির শেষ মুহূর্তের ককপিট যোগাযোগের অডিও রেকর্ডিং। এতে বোঝা যায়, বিধ্বস্ত হওয়ার আগে পাইলট ও ক্রুরা দ্রুত অবনতিশীল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন।
বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগের সময় প্রথমে ককপিট থেকে জানানো হয়েছিল, তারা বিমানের ওপর জমে থাকা বরফের পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন। একই সঙ্গে মাঝারি মাত্রার ঝাঁকুনির কথাও জানান এবং তুলনামূলক স্থিতিশীল আবহাওয়ার মধ্যে দিয়ে উড়তে চান বলে জানান।
কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। এক মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে ককপিট থেকে জরুরি বিপৎসংকেত পাঠানো হয়। পাইলট জানান, বিমানটি প্রতি মিনিটে প্রায় ১০ হাজার ফুট গতিতে নিচে নেমে যাচ্ছে।
এরপর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। বিমানের নিচে নামার গতি প্রতি মিনিটে প্রায় ২০ হাজার ফুটে পৌঁছানোর কথা জানানো হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই ককপিট থেকে শোনা যায়, বিমানটি মাটিতে বিধ্বস্ত হতে যাচ্ছে।
শেষ মুহূর্তে ক্রুদের কণ্ঠে শোনা যায়, তাদের হাতে আর সময় নেই। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, প্রথম বিপৎসংকেত পাঠানোর প্রায় ৩৫ সেকেন্ডের মধ্যেই যোগাযোগের সমাপ্তি ঘটে।
বিমানটির উল্লম্বভাবে নিচে নামার গতি একপর্যায়ে প্রতি মিনিটে ৩২ হাজার ফুটেরও বেশি হয়েছিল বলে ফ্লাইট ট্র্যাকিং তথ্য থেকে জানা গেছে। এত অল্প সময়ে পরিস্থিতি কীভাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল, সেটিই এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
আবহাওয়াও কি দুর্ঘটনার কারণ?
দুর্ঘটনার সময় ওই এলাকায় ভারী বৃষ্টিপাত ও বজ্রঝড় হচ্ছিল বলে আবহাওয়াসংক্রান্ত প্রাথমিক তথ্যে উঠে এসেছে। ককপিটের কথোপকথনেও বিমানের গায়ে বরফ জমার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছিল।
বিমানের ডানায় বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অংশে বরফ জমলে উড্ডয়নের স্বাভাবিক গতিবিদ্যা ও নিয়ন্ত্রণে সমস্যা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে প্রতিকূল আবহাওয়ায় বরফ জমা, বায়ুর ঝাঁকুনি এবং দ্রুত উচ্চতা হারানোর মতো ঘটনা একসঙ্গে ঘটলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতে পারে।
তবে এই দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে আবহাওয়াই সরাসরি দায়ী, এমন সিদ্ধান্ত এখনো আসেনি। যান্ত্রিক ত্রুটি, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সমস্যা, পাইলটের সিদ্ধান্ত কিংবা একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
নিরাপত্তার জন্য সরানো হলো শত শত বাসিন্দাকে
বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার পর আশপাশের এলাকায় ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দুর্ঘটনাস্থলের কাছেই ছিল একটি মোবাইল হোম পার্ক। বিস্ফোরণ ও আগুনের কারণে সেখানকার বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।
স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রায় ৬০০ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তাদের জন্য কাউন্টির দুটি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়।
পাম বিচ কাউন্টির কর্মকর্তারা জানান, দুর্ঘটনাস্থলের কাছে রাস্তার পাশে বিশাল গর্ত তৈরি হয়েছে। বিমানের ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে পড়ায় উদ্ধার ও তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে গভর্নর ডিস্যান্টিস জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে মাটিতে থাকা মানুষের মধ্যে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। ঘরবাড়ি ও গাড়ির খুব কাছাকাছি বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ায় বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারত।
তদন্তে নামছে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষজ্ঞ দল
দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় পরিবহন নিরাপত্তা বোর্ড তদন্ত শুরু করেছে। ফেডারেল এভিয়েশন প্রশাসনের বিশেষজ্ঞরাও তদন্তে সহায়তা করছেন।
বিমানের মালিকানা ডেলাওয়্যারভিত্তিক একটি করপোরেশনের নামে নিবন্ধিত ছিল বলে প্রাথমিক নথিতে উল্লেখ রয়েছে। কানাডাভিত্তিক নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোম্বার্ডিয়ার তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।
তদন্তকারীরা বিমানের ধ্বংসাবশেষ, ইঞ্জিন, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ পরীক্ষা করবেন। পাশাপাশি পাইলটদের সঙ্গে বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের শেষ মুহূর্তের কথোপকথনও বিশ্লেষণ করা হবে।
বিমানে থাকা নয়জনের পরিচয় ও দুর্ঘটনার সময় তাদের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা সম্পর্কে প্রাথমিক পর্যায়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
সব মিলিয়ে, ফ্লোরিডার এই দুর্ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের বিমান নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে একটি বিমান কীভাবে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে স্বাভাবিক উড্ডয়ন থেকে ভয়াবহ নিম্নমুখী পতনের মুখে পড়ল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তদন্তের ফল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অজানাই থাকছে।
