জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষাব্যবস্থার সংকট, বাধ্যতামূলক সামরিক পরিষেবার বিরোধিতা এবং তরুণ প্রজন্মের ওপর বাড়তে থাকা অর্থনৈতিক চাপের প্রতিবাদে জার্মানির ৩৪টি শহরে রাস্তায় নেমেছেন হাজার হাজার তরুণ। শুরুতে শান্তিপূর্ণ থাকলেও রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটি শহরে পরিস্থিতি সহিংস হয়ে ওঠে। বিশেষ করে দেশটির আর্থিক কেন্দ্র ফ্রাঙ্কফুর্টে দোকানের কাচ ভাঙচুর, লুটপাট, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং জরুরি সেবার কর্মীদের লক্ষ্য করে পেট্রলবোমা নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে।
৩১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত এসব বিক্ষোভে অংশ নেওয়া তরুণদের বড় একটি অংশের দাবি, জার্মানির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নীতিতে তাদের ভবিষ্যৎ যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, আবাসন এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ ক্রমেই বাড়ছে। এর মধ্যে বাধ্যতামূলক সামরিক পরিষেবা চালুর উদ্যোগ তরুণদের মধ্যে নতুন অসন্তোষ তৈরি করেছে।
৩৪ শহরে একই দাবিতে রাজপথে তরুণেরা
‘জেন জেড রেগেল্ট’ বা ‘তরুণ প্রজন্মই সিদ্ধান্ত নেবে’—এমন স্লোগানকে সামনে রেখে এই আন্দোলনের আয়োজন করা হয়। বার্লিন, ফ্রাঙ্কফুর্ট, মিউনিখসহ জার্মানির বড় বড় শহরে একযোগে কর্মসূচি পালিত হয়।
আয়োজকদের প্রত্যাশা ছিল, দেশজুড়ে প্রায় ১ লাখ ৮২ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেবেন। তবে পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, ফ্রাঙ্কফুর্ট, মিউনিখ ও বার্লিন—এই তিন শহরেই অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১৮ হাজার। আয়োজকদের প্রকাশিত হিসাব ছিল এর প্রায় দ্বিগুণ।
বিক্ষোভকারীদের অন্যতম প্রধান দাবি, শিক্ষা খাতে সরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবকাঠামোগত সংকট, শিক্ষকস্বল্পতা এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ তাদের। পাশাপাশি বাড়িভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে তরুণদের স্বাভাবিক জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়ছে।
ফ্রাঙ্কফুর্টে ভাঙচুর ও লুটপাট
বিক্ষোভের সবচেয়ে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয় ফ্রাঙ্কফুর্টে। দিনের কর্মসূচি অনেকটা শান্তিপূর্ণ থাকলেও সন্ধ্যার পর শহরের বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।
শহরের বিখ্যাত জাইল শপিং স্ট্রিটে একাধিক দোকানের কাচ ভেঙে ফেলা হয়। কয়েকটি দোকানে ঢুকে পণ্য লুটের ঘটনাও ঘটে। অন্তত দুটি দোকানে লুটপাটের খবর পাওয়া গেছে। কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
এ সময় পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ বাধে। জরুরি সেবার কর্মীদের লক্ষ্য করে পেট্রলবোমা ও বিভিন্ন বস্তু নিক্ষেপ করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এক হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়। বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিটের পাশাপাশি জলকামান, সাঁজোয়া যান ও হেলিকপ্টারও ব্যবহার করা হয়।
একপর্যায়ে শহরের একটি অস্ত্রের দোকানেও হামলা চালানো হয়। ঘটনাস্থল থেকে দুটি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করে পুলিশ। সহিংসতার ঘটনায় ৩০ জনের বেশি মানুষকে সাময়িকভাবে আটক করা হয়।
বার্লিন ও হামবুর্গেও উত্তেজনা
শুধু ফ্রাঙ্কফুর্ট নয়, বার্লিন, হামবুর্গ ও কোলনেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বার্লিনে প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষের একটি তরুণ বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের কর্মীরাও যোগ দেন।
কয়েকটি স্থানে আতশবাজি ও আগুন জ্বালানোর ঘটনা ঘটে। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রায় ২৭ জন কর্মকর্তা সামান্য আহত হন এবং প্রায় ৬০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
হামবুর্গে রাস্তায় তৈরি করা কয়েকটি ব্যারিকেডে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। কোলনেও পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষের পর জলকামান ব্যবহার করা হয়। সেখানে একজন পুলিশ সদস্য আহত হন।
তবে আন্দোলনের আয়োজকেরা সহিংসতার ঘটনাগুলো থেকে নিজেদের দূরে রাখার চেষ্টা করেছেন। তাদের বক্তব্য, শান্তিপূর্ণভাবে তরুণদের দাবি তুলে ধরাই ছিল কর্মসূচির উদ্দেশ্য।
কেন ক্ষোভ বাড়ছে জার্মান তরুণদের?
ইউরোপের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ জার্মানি সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিক স্থবিরতা, শিল্প খাতে চাপ এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের মতো সমস্যার মুখোমুখি। এসব সংকটের প্রভাব তরুণদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাতেও পড়ছে।
বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করার পর ভালো চাকরি পাওয়া, শহরাঞ্চলে সাশ্রয়ী বাসস্থান খুঁজে পাওয়া এবং আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ অনেকের কাছেই কঠিন হয়ে উঠেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামরিক পরিষেবা নিয়ে বিতর্ক। ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং রাশিয়ার সঙ্গে সংঘাতের প্রেক্ষাপটে জার্মানি সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু বাধ্যতামূলক সামরিক দায়িত্বের সম্ভাবনা তরুণদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ মনে করছে, দেশের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষার বিষয়েও সরকারকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
সরকারের সামনে নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ
জার্মানির কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভে উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর অনুপ্রবেশের আশঙ্কাও প্রকাশ করেছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য, কিছু চরমপন্থী গোষ্ঠী আন্দোলনকে নিজেদের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার চেষ্টা করতে পারে।
তবে তরুণদের অসন্তোষের পেছনে থাকা অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যাগুলোও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। আন্দোলনের ব্যাপকতা দেখিয়ে দিয়েছে, নতুন প্রজন্মের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সব মিলিয়ে, জার্মানির ৩৪ শহরের এই বিক্ষোভ কেবল একটি দিনের প্রতিবাদ নয়; বরং শিক্ষা, অর্থনীতি, সামরিক নীতি ও সামাজিক বৈষম্য নিয়ে তরুণদের জমে থাকা অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ। সরকার এসব দাবির কী জবাব দেয় এবং আন্দোলন নতুন কোনো পর্যায়ে পৌঁছায় কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
