ইউরোপের সমুদ্রবন্দরগুলোতে একযোগে ধর্মঘটে নেমেছেন হাজার হাজার শ্রমিক। ২২টি দেশের ১১৩টি বন্দরে এই কর্মসূচির কারণে পণ্য পরিবহন, জাহাজ চলাচল এবং ফেরি পরিষেবায় বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। শ্রমিকদের অভিযোগ, যুদ্ধের অস্ত্র পরিবহনে বন্দর ব্যবহার করা হচ্ছে, অথচ সমুদ্রপথে কাজ করা নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে না। পাশাপাশি দীর্ঘদিনের বেতনবৈষম্য, ঝুঁকিপূর্ণ কর্মপরিবেশ এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবার অভাব নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে তাদের।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত এই আন্তর্জাতিক ধর্মঘট ইউরোপের বন্দরশিল্পে নতুন করে চাপ তৈরি করেছে। শ্রমিকেরা বলছেন, তারা এমন কোনো ব্যবস্থার অংশ হতে চান না, যেখানে একদিকে যুদ্ধের জন্য অস্ত্র পরিবহন করা হবে, অন্যদিকে সমুদ্রকর্মীদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে থাকবে।
২২ দেশে একই দিনে কর্মবিরতি
ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বন্দর শ্রমিক সংগঠনগুলো সমন্বিতভাবে এই কর্মসূচিতে অংশ নেয়। মোট ২২টি দেশের ১১৩টি বন্দরে ধর্মঘট পালিত হয়। এর প্রভাব পড়ে পণ্যবাহী জাহাজ, ফেরি এবং বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক পরিবহন কার্যক্রমে।
গ্রিসের পিরেয়াস বন্দরে শ্রমিকদের অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য। সেখানে বিক্ষোভকারীরা যুদ্ধের জন্য অস্ত্র পরিবহনে বন্দর ব্যবহারের বিরোধিতা করেন। তাদের বক্তব্য, সমুদ্রপথকে যুদ্ধের রসদ সরবরাহের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হলে নাবিকদের নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশ আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে।
গ্রিসের বাণিজ্যিক নৌযান প্রকৌশলী শ্রমিক সংগঠনের নেতা আপোস্তোলস কিপ্রাইওস বলেন, তারা অন্যের যুদ্ধের জন্য কাজ করতে চান না এবং যুদ্ধের কামানের গোলার খাদ্য হতেও রাজি নন।
এই বক্তব্য ধর্মঘটের মূল বার্তাকে স্পষ্ট করে তুলেছে। শ্রমিকদের দাবি, বন্দরগুলোকে এমনভাবে পরিচালনা করতে হবে, যাতে আন্তর্জাতিক সংঘাতের কারণে সাধারণ সমুদ্রকর্মীদের জীবন বিপন্ন না হয়।
যুদ্ধক্ষেত্রের কাছাকাছি নাবিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
বর্তমানে ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রের কাছাকাছি দিয়ে চলাচল করা বাণিজ্যিক জাহাজ হামলা, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা অন্য সামরিক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এসব জাহাজে কর্মরত নাবিকদের অনেক সময় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম কিংবা জরুরি চিকিৎসাসেবা ছাড়াই কাজ করতে হয় বলে অভিযোগ শ্রমিক সংগঠনগুলোর।
তাদের দাবি, যুদ্ধপ্রবণ অঞ্চলে চলাচলকারী জাহাজে পর্যাপ্ত চিকিৎসক বা প্রশিক্ষিত চিকিৎসাকর্মী রাখতে হবে। কোনো নাবিক আহত হলে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে জাহাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে কর্মীদের সম্মতি ও নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
বেতন ও কর্মপরিবেশ নিয়েও ক্ষোভ
ধর্মঘটের পেছনে শুধু যুদ্ধবিরোধী অবস্থানই কাজ করেনি। শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক দাবিও রয়েছে।
তাদের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সামুদ্রিক পরিবহন খাতে আয় বাড়লেও বন্দরের শ্রমিকদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা সেই অনুপাতে বাড়েনি। অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় কাজ করতে হয়, কিন্তু পর্যাপ্ত বিশ্রাম কিংবা নিরাপদ কর্মপরিবেশ পাওয়া যায় না।
শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, মজুরি বৃদ্ধি, কাজের সময় নির্ধারণ, স্বাস্থ্যসুরক্ষা এবং কর্মীদের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সমুদ্রপথে কাজ করা নাবিকদের জন্য উন্নত চিকিৎসা ও জরুরি সহায়তার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
বন্দর ধর্মঘটে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রভাব
ইউরোপের বন্দরগুলো আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখান দিয়ে জ্বালানি, খাদ্যপণ্য, শিল্পের কাঁচামাল, গাড়ি, যন্ত্রপাতি ও ভোগ্যপণ্য পরিবহন করা হয়।
১১৩টি বন্দরে একযোগে কর্মবিরতি হলে পণ্য ওঠানো-নামানো এবং জাহাজের সময়সূচিতে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। কোনো বন্দরে কাজ বন্ধ থাকলে জাহাজকে অপেক্ষা করতে হয়, আবার কোনো ক্ষেত্রে বিকল্প বন্দরের দিকে যেতে হয়। এতে পরিবহন ব্যয় ও পণ্য সরবরাহের সময় বাড়তে পারে।
বিশেষ করে যেসব পণ্য নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পৌঁছানো জরুরি, সেগুলোর সরবরাহে বিলম্বের ঝুঁকি তৈরি হয়। ফেরি পরিষেবায় বিঘ্ন ঘটলে যাত্রী ও যানবাহন পরিবহনও সমস্যায় পড়ে।
তবে সব বন্দরে কতক্ষণ কর্মবিরতি চলেছে এবং মোট কত পণ্য পরিবহন ব্যাহত হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো পাওয়া যায়নি।
ইউরোপের শ্রমিক আন্দোলনে নতুন মাত্রা
এই ধর্মঘটের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, শ্রমিকদের অর্থনৈতিক দাবির সঙ্গে আন্তর্জাতিক যুদ্ধ ও মানবিক নিরাপত্তার প্রশ্ন যুক্ত হয়েছে। সাধারণত বেতন বৃদ্ধি বা কর্মপরিবেশের দাবিতে বন্দর শ্রমিকেরা ধর্মঘট করেন। কিন্তু এবার অস্ত্র পরিবহন বন্ধের দাবিও সামনে এসেছে।
শ্রমিক সংগঠনগুলোর বক্তব্য, বাণিজ্যিক জাহাজের কর্মীদের জীবনকে কোনোভাবেই সামরিক সংঘাতের ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেওয়া উচিত নয়।
অন্যদিকে, বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্যও বিষয়টি জটিল। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা এবং শ্রমিকদের অধিকার—এই তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ইউরোপের ২২ দেশের ১১৩ বন্দরের এই ধর্মঘট শুধু শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনা নয়; এটি যুদ্ধ, অস্ত্র পরিবহন, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত একটি বড় প্রতিবাদ। শ্রমিকদের দাবির বিষয়ে সরকার ও বন্দর কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেয়, তার ওপর নির্ভর করবে এই আন্দোলনের পরবর্তী গতিপথ।
