যুদ্ধের ময়দানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার আতঙ্কের মধ্যেই এবার নতুন এক সাইবার বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে রাশিয়া ও ইউক্রেন। দুই দেশের জরুরি সতর্কবার্তা দেওয়ার মোবাইল অ্যাপে সাইবার হামলা চালিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে পারমাণবিক হামলা, তেজস্ক্রিয়তা ও রাসায়নিক বিপদের ভুয়া বার্তা। ইউক্রেনের বাসিন্দাদের ফোনে এমনকি রাশিয়ার ভয়ংকর হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ওরেশনিক নিক্ষেপের কথাও জানানো হয়। অন্যদিকে, রাশিয়ার জরুরি পরিস্থিতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অ্যাপেও পারমাণবিক ওয়ারহেড নিক্ষেপের ভুয়া সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছে।
রোববার (১ নভেম্বর) রাতে শুরু হওয়া এই ঘটনার পর দুই দেশই তাদের জরুরি সতর্কীকরণ ব্যবস্থায় অননুমোদিত প্রবেশের কথা জানিয়েছে। ইউক্রেনের কর্তৃপক্ষ অ্যাপটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। পরে নিরাপত্তা পরীক্ষা শেষে ধীরে ধীরে পরিষেবা পুনরুদ্ধার করা হয়। রাশিয়াও তাদের অ্যাপে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি স্বীকার করেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, যুদ্ধের মধ্যে সাধারণ মানুষকে আসন্ন বিপদের বিষয়ে সতর্ক করার জন্য ব্যবহৃত ব্যবস্থাকেই আতঙ্ক ছড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
ইউক্রেনের ফোনে পারমাণবিক হামলার সতর্কবার্তা
ইউক্রেনে ‘এয়ার অ্যালার্ট’ নামের একটি মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করা হয়। রুশ ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন কিংবা বিমান হামলার আশঙ্কা দেখা দিলে এই অ্যাপের মাধ্যমে নির্দিষ্ট এলাকার মানুষকে সতর্ক করা হয়।
যুদ্ধের সময় দেশটির লাখ লাখ মানুষের দৈনন্দিন নিরাপত্তার সঙ্গে এই ব্যবস্থাটি জড়িয়ে গেছে। ফলে অ্যাপটিতে ভুয়া বার্তা পাঠানোর ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করে।
রোববার রাতে অ্যাপ ব্যবহারকারীদের কাছে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়া, রাসায়নিক হামলা এবং বিভিন্ন এলাকায় রাস্তায় সংঘর্ষের আশঙ্কা জানিয়ে বার্তা পাঠানো হয়। একটি বার্তায় বলা হয়, পুরো ইউক্রেনজুড়ে পারমাণবিক সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
আরও অদ্ভুত ছিল রুশ ভাষায় পাঠানো একটি বার্তা। সেখানে বলা হয়, রাশিয়ার ওরেশনিক ক্ষেপণাস্ত্র আসছে। এটি এমনভাবে লেখা হয়েছিল, যেন কোনো আনুষ্ঠানিক সামরিক সতর্কবার্তা নয়, বরং আতঙ্ক ছড়ানোর উদ্দেশ্যে তৈরি একটি বার্তা।
ইউক্রেনের বিমানবাহিনী দ্রুত জানায়, অ্যাপটি শত্রুপক্ষের প্রভাব বা সাইবার হামলার শিকার হয়ে থাকতে পারে। একই সঙ্গে তারা স্পষ্ট করে দেয়, দেশে কোনো তেজস্ক্রিয়তার হুমকি নেই এবং মানুষকে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানায়।
রাশিয়ার জরুরি অ্যাপেও একই ধরনের হামলা
ইউক্রেনের ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে রাশিয়ার জরুরি পরিস্থিতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় জানায়, তাদের মোবাইল অ্যাপেও বড় ধরনের সাইবার হামলা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, হ্যাকাররা অ্যাপটির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে মিথ্যা তথ্য পাঠাতে সক্ষম হয়। রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে পারমাণবিক ওয়ারহেড নিক্ষেপের মতো ভুয়া সতর্কবার্তা ছড়িয়ে পড়ে।
রুশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হামলার কারণে মূল সরকারি সতর্কীকরণ ব্যবস্থা অচল হয়ে যায়নি। মোবাইল অ্যাপটি ছিল অতিরিক্ত তথ্য সরবরাহের একটি মাধ্যম। সমস্যাটি শনাক্ত করার পর সেটি ঠিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
রাশিয়ার বিভিন্ন আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষ ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত স্ক্রিনশটে পারমাণবিক হামলার ভুয়া বার্তার বিষয়টি উঠে এসেছে।
একই সময়ে দুই দেশের অ্যাপে হামলা, কারা জড়িত?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, রাশিয়া ও ইউক্রেনের অ্যাপে প্রায় একই সময়ে সাইবার হামলা চালানোর পেছনে কারা রয়েছে।
ইউক্রেনের বিমানবাহিনী ও দেশটির কৌশলগত যোগাযোগবিষয়ক সংস্থা রাশিয়ার দিকে অভিযোগের আঙুল তুলেছে। তাদের ধারণা, শত্রুপক্ষের সাইবার তৎপরতার মাধ্যমে এই বিভ্রান্তি তৈরি করা হয়েছে।
তবে রাশিয়ার পক্ষ থেকেও ইউক্রেনকে দায়ী করার মতো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। মস্কো শুধু জানিয়েছে, তাদের অ্যাপে ক্ষতিকর পক্ষের অনুপ্রবেশ ঘটেছে।
দুই দেশের অ্যাপে হামলার ধরন ও সময়ের মিল থাকলেও ঘটনাগুলো একই হ্যাকার গোষ্ঠী ঘটিয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কোনো রাষ্ট্রীয় সংস্থা, অপরাধী হ্যাকার দল কিংবা অন্য কোনো পক্ষ জড়িত কি না, সেটিও তদন্তের বিষয়।
সাইবার যুদ্ধের নতুন বিপজ্জনক দিক
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের শুরু থেকেই দুই পক্ষের বিরুদ্ধে সাইবার হামলা, তথ্যপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি এবং ডিজিটাল অবকাঠামো লক্ষ্য করার অভিযোগ উঠেছে। সরকারি ওয়েবসাইট, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো বিভিন্ন সময়ে সাইবার আক্রমণের লক্ষ্য হয়েছে।
কিন্তু জরুরি সতর্কবার্তা ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশের ঘটনা আলাদা মাত্রার ঝুঁকি তৈরি করে। কারণ, যুদ্ধের সময় মানুষ আকাশপথের হামলা থেকে বাঁচতে এসব সতর্কবার্তার ওপর নির্ভর করে।
ভুয়া সতর্কবার্তা ছড়িয়ে পড়লে মানুষ অপ্রয়োজনে আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটতে পারে, হাসপাতাল ও জরুরি পরিষেবায় চাপ তৈরি হতে পারে কিংবা প্রকৃত হামলার সময় মানুষ সতর্কবার্তাকে গুরুত্ব দেওয়া বন্ধ করে দিতে পারে।
এমনকি একই সময়ে প্রকৃত হামলার সতর্কবার্তা এলে মানুষ সেটিকেও ভুয়া মনে করার ঝুঁকি রয়েছে। ফলে সাইবার হামলার প্রভাব শুধু ডিজিটাল ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ থাকে না, মানুষের জীবন রক্ষার ব্যবস্থাকেও দুর্বল করে দিতে পারে।
সামরিক ব্যবস্থায় প্রভাব পড়েনি বলে দাবি কিয়েভের
ইউক্রেনের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জরুরি সতর্কীকরণ অ্যাপে অনুপ্রবেশের কারণে তাদের সামরিক অভিযান বা সেনাবাহিনীর যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। সামরিক বাহিনী আলাদা যোগাযোগ অবকাঠামো ব্যবহার করে।
অ্যাপটির নির্মাতারা জানিয়েছেন, অননুমোদিত তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপের কারণে সাময়িকভাবে কার্যক্রম বন্ধ করতে হয়েছিল। নিরাপত্তা জোরদার করার পর পরিষেবা পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে, রাশিয়া ও ইউক্রেনের জরুরি সতর্কবার্তা অ্যাপে এই সাইবার হামলা যুদ্ধের নতুন এক বাস্তবতা সামনে এনেছে। এখন শুধু আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনের গতিবিধি নয়, মানুষের মোবাইল ফোনে পৌঁছানো সতর্কবার্তার সত্যতা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে দুই দেশকে তাদের ডিজিটাল নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে।
