মিয়ানমারের সামরিক শাসনের অবসান, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি এবং চলমান গৃহযুদ্ধ বন্ধে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ানের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আবারও বড় প্রশ্নের মুখে পড়েছে। দেশটিতে দুই দিনের সফর শেষে অং সান সু চির সঙ্গে সাক্ষাৎ ছাড়াই ফিরে গেছেন আসিয়ানের বিশেষ দূত ও ফিলিপাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী থেরেসা লাজারো। সু চির সঙ্গে দেখা করার জন্য ফিলিপাইনের পক্ষ থেকে একাধিকবার অনুরোধ জানানো হলেও শেষ পর্যন্ত সেই সুযোগ মেলেনি। ফলে মিয়ানমারের সংকট সমাধানে আসিয়ানের মধ্যস্থতা কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে নতুন করে সংশয় তৈরি হয়েছে।
২৮ ও ২৯ অক্টোবরের সফরে লাজারো মিয়ানমারের বিভিন্ন এলাকায় মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন এবং দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী তিন মং সুয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন। আলোচনায় গৃহযুদ্ধ, মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং আসিয়ানে মিয়ানমারের আগের অবস্থান ও অধিকার পুনরুদ্ধারের বিষয় উঠে আসে। তবে সু চির সঙ্গে সাক্ষাৎ না হওয়ায় সফরের রাজনৈতিক গুরুত্ব অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়েছে।
সু চির সঙ্গে সাক্ষাৎ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। এরপর সু চি ও তার দলের বহু নেতাকে আটক করা হয়। একাধিক মামলায় দণ্ডিত হয়ে সু চি দীর্ঘদিন কারাগারে ছিলেন। চলতি বছরের এপ্রিলে তাকে কারাগার থেকে সরিয়ে গৃহবন্দি অবস্থায় রাখা হয়েছে বলে জানায় দেশটির সামরিক-সমর্থিত প্রশাসন। তবে তার অবস্থান, শারীরিক অবস্থা এবং বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
সু চি শুধু মিয়ানমারের সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান নন; তিনি দেশটির গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনের সবচেয়ে পরিচিত মুখ। তার সঙ্গে আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের যোগাযোগের সুযোগ পাওয়া রাজনৈতিক বন্দিদের অবস্থা এবং সামরিক সরকারের সদিচ্ছা যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ উপায় হিসেবে বিবেচিত হয়। এ কারণেই আসিয়ানের বিশেষ দূতের সঙ্গে তার সাক্ষাৎকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মনে করা হচ্ছিল।
ফিলিপাইন চলতি বছর আসিয়ানের ঘূর্ণায়মান সভাপতির দায়িত্ব পালন করছে। সে কারণে লাজারোর সফরকে শুধু দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক সফর হিসেবে দেখা হচ্ছে না; বরং মিয়ানমার সংকট নিয়ে পুরো জোটের অবস্থান যাচাইয়ের একটি প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। এর আগে এপ্রিল ও আগস্টেও সু চির সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু এবারও সেই অনুরোধ পূরণ হয়নি।
জান্তা সরকারের সঙ্গে আলোচনায় কী উঠে এল
মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, লাজারো ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী তিন মং সুয়ের মধ্যে ‘গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা’ হয়েছে। আলোচনার একটি বিষয় ছিল আসিয়ানের মধ্যে মিয়ানমারের আগের ভূমিকা ও অধিকার পুনরুদ্ধারের পথ খোঁজা। তবে সু চির সঙ্গে সাক্ষাৎ বা রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি নিয়ে কোনো স্পষ্ট অগ্রগতির কথা জানানো হয়নি।
সামরিক অভ্যুত্থানের পর আসিয়ান মিয়ানমারের জান্তা নেতাদের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশগ্রহণ সীমিত করে। জোটের সদস্য দেশগুলো ২০২১ সালের এপ্রিলে একটি পাঁচ দফা ঐকমত্যে পৌঁছেছিল। এতে সহিংসতা বন্ধ, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে সংলাপ, আসিয়ানের বিশেষ দূতের মধ্যস্থতা, মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে দূতের সাক্ষাতের সুযোগ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছিল।
কিন্তু পাঁচ দফা ঐকমত্য বাস্তবায়নে মিয়ানমারের সামরিক প্রশাসনের অগ্রগতি খুবই সীমিত। দেশজুড়ে সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে, রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগ রয়েছে এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে আসিয়ানের সদস্য দেশগুলোর মধ্যেও মিয়ানমার প্রশ্নে হতাশা বাড়ছে।
মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে গুরুত্ব
লাজারোর সফরের একটি বড় অংশজুড়ে ছিল মানবিক সহায়তা কার্যক্রম। তিনি কারেন রাজ্য এবং উত্তর ও দক্ষিণ শান রাজ্যে সহায়তা বিতরণ কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন। এই উদ্যোগের আওতায় নভেম্বর পর্যন্ত ১১ হাজারের বেশি পরিবারকে চাল, স্বাস্থ্যবিধি সামগ্রী এবং প্রয়োজনীয় নিত্যপণ্য দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারে সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে। সামরিক বাহিনী, জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন এবং গণতন্ত্রপন্থী প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে লড়াইয়ের কারণে লাখ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে। বহু এলাকায় খাদ্য, চিকিৎসা, নিরাপদ পানি এবং আশ্রয়ের সংকট দেখা দিয়েছে। সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে মানবিক সহায়তা পৌঁছানোও কঠিন।
আসিয়ানের বিশেষ দূতের সফরে সহায়তা বিতরণ পর্যবেক্ষণ তাই গুরুত্বপূর্ণ হলেও, শুধু ত্রাণ কার্যক্রম দিয়ে দেশটির রাজনৈতিক সংকট সমাধান সম্ভব নয়। মানবিক সহায়তার পাশাপাশি সংঘাত বন্ধ এবং রাজনৈতিক আলোচনার পথ তৈরি করা জরুরি।
সু চির সাম্প্রতিক যোগাযোগ ঘিরে নতুন প্রশ্ন
সাম্প্রতিক সময়ে সু চির সঙ্গে বাইরের বিশ্বের সীমিত যোগাযোগের কয়েকটি ঘটনা সামনে এসেছে। পাঁচ বছরের বেশি সময় পর গত ২২ অক্টোবর তার ছেলে কিম অ্যারিসের সঙ্গে প্রায় ২০ মিনিটের টেলিফোনে কথা বলার সুযোগ হয়। এর আগে ব্রিটিশ রাজা তৃতীয় চার্লসের পাঠানো বই ও কূটনৈতিক বার্তাও তার কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়।
এসব ঘটনা সু চির অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক আগ্রহ বাড়িয়েছে। তবে তার ছেলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, সীমিত যোগাযোগের সুযোগ দিয়ে সামরিক-সমর্থিত সরকার আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের ভাবমূর্তি উন্নত করার চেষ্টা করতে পারে। সু চির সঙ্গে স্বাধীন আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের নিয়মিত যোগাযোগের সুযোগ না থাকায় তার প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া কঠিন।
আসিয়ানের সামনে কঠিন পরীক্ষা
নভেম্বরের মাঝামাঝি ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় আসিয়ানের বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। তার আগে লাজারোর মিয়ানমার সফর ছিল পরিস্থিতি যাচাই এবং রাজনৈতিক সমাধানের পথ খোঁজার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। কিন্তু সু চির সঙ্গে সাক্ষাৎ না হওয়া এবং সংঘাত বন্ধে দৃশ্যমান অগ্রগতি না আসায় সম্মেলনে মিয়ানমার প্রশ্নটি আবারও বড় আলোচনার বিষয় হতে পারে।
আসিয়ানের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, সদস্য দেশগুলোর মধ্যে মিয়ানমারকে কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, তা নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। কেউ কঠোর চাপ প্রয়োগের পক্ষে, কেউ আবার সংলাপ ও ধীরে ধীরে সম্পৃক্ততা বাড়ানোর পক্ষে। এই বিভক্ত অবস্থানের সুযোগ নিয়ে মিয়ানমারের সামরিক প্রশাসন আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা কাটানোর চেষ্টা করছে।
লাজারো সু চির সঙ্গে দেখা করতে না পারায় আসিয়ানের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সীমাবদ্ধতা আবারও স্পষ্ট হয়েছে। এখন প্রশ্ন, ম্যানিলার সম্মেলনে জোটটি নতুন কোনো কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারবে, নাকি মিয়ানমারের সংকট আরও দীর্ঘায়িত হবে। দেশটির সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো সহিংসতা বন্ধ, রাজনৈতিক বন্দিদের নিরাপত্তা এবং মানবিক সহায়তার অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা।The Straits Times+2
