রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মধ্যে বিরল এক মানবিক উদ্যোগের সাক্ষী হলো দক্ষিণ ইউক্রেনের ওলেশকি শহর। যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে স্থানীয়ভাবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর শহরটি থেকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে শত শত বেসামরিক মানুষকে। কয়েক মাস ধরে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসাসেবার সংকটে আটকে থাকা এসব মানুষের জন্য এই উদ্ধার অভিযান নতুন করে বেঁচে থাকার আশা তৈরি করেছে।
ইউক্রেনের খেরসন অঞ্চলে অবস্থিত ওলেশকি শহরটি ২০২২ সাল থেকে রুশ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। যুদ্ধের কারণে শহরটির স্বাভাবিক জীবনযাত্রা প্রায় সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। একসময় প্রায় ২৪ হাজার মানুষের বসবাস থাকলেও বর্তমানে সেখানে রয়ে গেছেন আনুমানিক ১ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার মানুষ। তাদের মধ্যে অধিকাংশই বয়স্ক, অসুস্থ ও চলাচলে অক্ষম। রয়েছেন প্রায় ৫০ জন শিশুও।
শহরটির চারপাশে মাইন পুঁতে রাখা রাস্তা, ড্রোন হামলার ঝুঁকি এবং নিয়মিত গোলাবর্ষণের কারণে বেসামরিক মানুষের পক্ষে বেরিয়ে আসা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে মেলানিয়া ট্রাম্পের উদ্যোগে দুই দেশের মধ্যে সাময়িক যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা এবং মানবিক করিডর চালুর ব্যবস্থা করা হয়।
কীভাবে সম্ভব হলো যুদ্ধবিরতি?
ওলেশকির মানবিক বিপর্যয়ের বিষয়টি মেলানিয়া ট্রাম্পের নজরে আসে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সময় নিউইয়র্কে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে। সেখানে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার পর তিনি রাশিয়া ও ইউক্রেনের নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগের উদ্যোগ নেন।
এর আগে যুদ্ধের মধ্যে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়া ইউক্রেনীয় শিশুদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়েও মেলানিয়া কাজ করেছিলেন। সেই যোগাযোগের ধারাবাহিকতা কাজে লাগিয়ে এবার তিনি ওলেশকির বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে দুই পক্ষের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন।
হোয়াইট হাউসের ঘোষণা অনুযায়ী, উভয় দেশ শহরটিতে সাময়িকভাবে সামরিক তৎপরতা বন্ধ রাখতে সম্মত হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া, ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক থেকে মাইন অপসারণ এবং বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া।
২৯ অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া এই স্থানীয় যুদ্ধবিরতির আওতায় দুই দেশের বেসামরিক প্রতিনিধি ও মানবিক সহায়তাকর্মীদের সমন্বয়ে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
২৫টি বাসে উদ্ধার অভিযান
৩০ অক্টোবর শুক্রবার থেকে ওলেশকির বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়। ইউক্রেনের মানবাধিকারবিষয়ক ন্যায়পাল দিমিত্রো লুবিনেতস নিজে উদ্ধার অভিযানে অংশ নেন। তাঁর উপস্থিতি এই উদ্যোগের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়।
অভিযানে ২৫টি বাস ব্যবহার করা হয়, যেগুলোর মোট আসনসংখ্যা ছিল প্রায় ৭৫০। শহর থেকে বেরিয়ে আসতে ইচ্ছুক মানুষদের পর্যায়ক্রমে নিরাপদ স্থানে নেওয়া হয়।
তবে উদ্ধার অভিযানটি সরাসরি ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় পৌঁছানোর মতো সহজ ছিল না। ওলেশকি ও ইউক্রেনীয় নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ডের মাঝখানে রয়েছে দিনিপ্রো নদী। সরাসরি নদী পেরিয়ে নিরাপদে যাওয়ার সুযোগ না থাকায় বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হয়।
প্রথমে উদ্ধার হওয়া মানুষদের রুশ নিয়ন্ত্রিত ক্রিমিয়া হয়ে রাশিয়ার আনাপা অঞ্চলে নেওয়া হয়। সেখান থেকে বিমানে করে বেলারুশের গোমেল শহরে পৌঁছানো হয়। এরপর তাদের ইউক্রেনের সীমান্তে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
ইউক্রেনীয় সংসদ সদস্য দাভিদ আরাখামিয়া জানান, উদ্ধার হওয়া ইউক্রেনীয় নাগরিকদের নিয়ে চতুর্থ ও শেষ বিমানটিও গোমেলে পৌঁছেছে। এর মাধ্যমে উদ্ধার অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যায় সম্পন্ন হয়।
ক্ষুধা ও চিকিৎসার অভাবে বিপর্যস্ত বাসিন্দারা
ওলেশকিতে আটকে থাকা মানুষদের পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত সংকটাপন্ন। দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত খাদ্য সরবরাহ না থাকায় অনেকেই অপুষ্টি ও ক্ষুধার মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন। বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় ওষুধের অভাবও ছিল প্রকট।
শহরটির অধিকাংশ বাসিন্দা বয়স্ক হওয়ায় তাদের অনেকের নিয়মিত চিকিৎসা প্রয়োজন। কেউ স্ট্রোকে আক্রান্ত, কেউ চলাচলে অক্ষম, আবার কেউ দীর্ঘদিনের অসুস্থতায় ভুগছিলেন।
উদ্ধার হওয়া মানুষদের গ্রহণের জন্য ইউক্রেনের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। চেরনিহিভ আঞ্চলিক হাসপাতালের প্রধান জানিয়েছেন, উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে আহত মানুষ, স্ট্রোক থেকে বেঁচে যাওয়া রোগী এবং চলাচলে সীমাবদ্ধতা রয়েছে এমন ব্যক্তিও আছেন।
অনেকের শারীরিক অবস্থা এতটাই দুর্বল যে তাদের খাবার দেওয়ার ক্ষেত্রেও বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। দীর্ঘদিন অপুষ্টিতে থাকার পর হঠাৎ স্বাভাবিক খাবার খাওয়ানো স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
মাইন অপসারণ করতে গিয়ে প্রাণহানি
উদ্ধার অভিযানের সবচেয়ে বিপজ্জনক অংশ ছিল শহর থেকে বের হওয়ার সড়কগুলো নিরাপদ করা। রাস্তায় মাইন পুঁতে রাখা এবং বিভিন্ন স্থানে ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে থাকায় সাধারণ যানবাহনের চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর দুই দেশের সংশ্লিষ্ট দল রাস্তা থেকে মাইন অপসারণের কাজ শুরু করে। বৃহস্পতিবারের মধ্যে এই কাজ শেষ হয়েছে বলে দুই পক্ষের পক্ষ থেকেই জানানো হয়।
তবে এই অভিযানের সময়ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। মাইন অপসারণ কার্যক্রমে অংশ নেওয়া দুজন নিহত হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
এ ঘটনা প্রমাণ করে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও যুদ্ধক্ষেত্রের বিপদ সঙ্গে সঙ্গে দূর হয় না। উদ্ধারকর্মী ও বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি পদক্ষেপে সতর্কতা প্রয়োজন।
যুদ্ধবিরতি কি বৃহত্তর শান্তির পথ দেখাবে?
ওলেশকির যুদ্ধবিরতিকে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এটি পুরো যুদ্ধের অবসান নয়। বরং নির্দিষ্ট একটি শহরকে কেন্দ্র করে সাময়িকভাবে সামরিক তৎপরতা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত।
মেলানিয়া ট্রাম্প আশা প্রকাশ করেছেন, ওলেশকির এই উদ্যোগ দুই দেশের মধ্যে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের শান্তিপ্রক্রিয়ার ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
এদিকে ইউক্রেনের মানবাধিকারবিষয়ক ন্যায়পাল জানিয়েছেন, ভবিষ্যতেও এ ধরনের মানবিক উদ্যোগ অব্যাহত রাখার সম্ভাবনা নিয়ে রাশিয়ার সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করা হচ্ছে।
তবে যুদ্ধবিরতির সময়সীমা শেষ হওয়ার পর খেরসন অঞ্চলে আবারও সামরিক উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। ইউক্রেনের কর্মকর্তারা রুশ ড্রোন হামলার খবর জানিয়েছেন। ফলে উদ্ধার হওয়া মানুষের নিরাপত্তার পাশাপাশি শহরে থেকে যাওয়া বাসিন্দাদের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
ওলেশকির বাকি বাসিন্দাদের ভবিষ্যৎ কী?
শত শত মানুষকে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হলেও শহরটিতে এখনো অনেক বাসিন্দা রয়ে গেছেন। কেউ নিজের বাড়িঘর ছেড়ে যেতে চান না, আবার কেউ শারীরিক অসুস্থতা কিংবা পারিবারিক কারণে অন্যত্র যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না।
মেলানিয়ার পরিকল্পনা অনুযায়ী, দুই দেশের বেসামরিক প্রতিনিধিরা বাসিন্দাদের বাড়িতে গিয়ে তাদের প্রয়োজন যাচাই করবেন। যারা চলে যেতে চান, তাদের পছন্দ অনুযায়ী ইউক্রেন কিংবা রাশিয়ার দিকে যাওয়ার ব্যবস্থা করার কথা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, ওলেশকি থেকে শত শত মানুষের উদ্ধার রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য মানবিক ঘটনা। যদিও এই উদ্যোগ যুদ্ধের অবসান ঘটায়নি, তবু সামরিক প্রতিপক্ষ দুই দেশের মধ্যে সীমিত সহযোগিতার একটি বাস্তব উদাহরণ তৈরি করেছে। এখন বড় প্রশ্ন, এই মানবিক সমঝোতা কি ভবিষ্যতে আরও শহরের বেসামরিক মানুষকে উদ্ধারের পথ খুলে দেবে, নাকি যুদ্ধের বিস্তৃত বাস্তবতায় ওলেশকির ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন একটি উদ্যোগ হিসেবেই থেকে যাবে?
