রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করতে বড় ধরনের সামরিক সহায়তার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি ইউক্রেনের জন্য ৫০০টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে। অত্যাধুনিক এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য আকাশপথের হামলা প্রতিহত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এই বিপুল অস্ত্রের ব্যয় সরাসরি বহন করছে না ওয়াশিংটন। ইউরোপের মিত্র দেশ ও কানাডার অর্থায়নে প্রায় ২১০ কোটি ডলারের এই সরবরাহ সম্পন্ন হওয়ার কথা।
৩০ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তের কথা প্রকাশ্যে আসে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও দ্রুত ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁর আশঙ্কা, নতুন ক্ষেপণাস্ত্র হাতে পেতে ইউক্রেনকে কয়েক বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।
এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ইউক্রেনের বিদ্যুৎকেন্দ্র, জ্বালানি অবকাঠামো ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে রাশিয়ার হামলা বেড়েছে। শীতের আগে এসব স্থাপনা রক্ষায় কিয়েভের জন্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র?
প্যাট্রিয়ট যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি একটি অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। এটি মূলত শত্রুপক্ষের বিমান, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং নির্দিষ্ট ধরনের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত ও ধ্বংস করার জন্য তৈরি।
বিশেষ করে রাশিয়ার ইস্কান্দারসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার ক্ষেত্রে প্যাট্রিয়ট ইউক্রেনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
রাশিয়া যুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে ইউক্রেনের শহর, সামরিক স্থাপনা, বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অল্প সময়ের মধ্যে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি করা হয়েছে।
এ ধরনের হামলা মোকাবিলায় শুধু আকাশ প্রতিরক্ষা রাডার থাকলেই হয় না। শনাক্ত করা লক্ষ্যবস্তুকে ধ্বংস করার জন্য পর্যাপ্ত ইন্টারসেপ্টর বা প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রও প্রয়োজন। ইউক্রেনের জন্য বর্তমানে সেটিই বড় সমস্যা।
২১০ কোটি ডলারের ক্ষেপণাস্ত্র, অর্থ দেবে কারা?
যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদিত ৫০০টি ক্ষেপণাস্ত্রের সম্ভাব্য মূল্য প্রায় ২১০ কোটি ডলার। মার্কিন প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই অর্থের পুরোটা ইউরোপের মিত্র দেশ ও কানাডার পক্ষ থেকে সরবরাহ করা হবে।
অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্র অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন ও সরবরাহের প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখলেও এর আর্থিক দায়ভার বহন করবে ইউক্রেনের সহযোগী দেশগুলো।
এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ওয়াশিংটন একদিকে ইউক্রেনকে প্রয়োজনীয় সামরিক সরঞ্জাম পাওয়ার সুযোগ দিচ্ছে, অন্যদিকে সরাসরি মার্কিন অর্থায়নের ওপর চাপ কমাচ্ছে।
ইউরোপের দেশগুলোর জন্যও এই সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়লে রাশিয়ার হামলার প্রভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপরও তার প্রভাব পড়তে পারে।
জেলেনস্কির উদ্বেগ, ক্ষেপণাস্ত্র আসতে লাগতে পারে কয়েক বছর
যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদনকে স্বাগত জানালেও জেলেনস্কি দ্রুত সরবরাহের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য, ইউক্রেনের হাতে এখনই প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রয়োজন।
সমস্যা হলো, এই ক্ষেপণাস্ত্রের বিশ্বব্যাপী উৎপাদনক্ষমতা সীমিত। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের উৎপাদনসংক্রান্ত হিসাব অনুযায়ী, বছরে প্রায় ৬০০টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা হয়।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ নিজেদের প্রতিরক্ষার জন্যও এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে। মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সংঘাতেও প্যাট্রিয়টের ব্যাপক ব্যবহার হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে এর চাহিদা বেড়েছে।
ফলে নতুন করে ৫০০টি ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ও সরবরাহ করতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। এই চুক্তির আওতায় পুরোনো মজুত থেকে ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের পরিবর্তে নতুন করে উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেছে।
এ কারণেই অনুমোদন পাওয়া আর বাস্তবে ক্ষেপণাস্ত্র হাতে পাওয়া—এই দুইয়ের মধ্যে বড় সময়ের ব্যবধান তৈরি হতে পারে।
রাশিয়ার হামলা বাড়ছে, শীতের আগে বাড়তি উদ্বেগ
ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামো নিয়ে উদ্বেগের কারণও রয়েছে। শীত মৌসুমে বিদ্যুৎ ও তাপ সরবরাহ সচল রাখা দেশটির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়া অতীতে একাধিকবার বিদ্যুৎকেন্দ্র, বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থা ও জ্বালানি স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
জেলেনস্কি জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক দুই সপ্তাহে ইউক্রেনের বিদ্যুৎ গ্রিডের গুরুত্বপূর্ণ অংশে ৩০টির বেশি রুশ হামলার ঘটনা ঘটেছে।
এ ধরনের হামলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হলে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি হাসপাতাল, শিল্পকারখানা, পানি সরবরাহ ও যোগাযোগব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা বাড়লে ইউক্রেন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর চারপাশে প্রতিরক্ষা জোরদার করতে পারবে। তবে সব ধরনের ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার জন্য শুধু প্যাট্রিয়ট যথেষ্ট নয়। এজন্য স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার অন্যান্য প্রতিরক্ষাব্যবস্থারও প্রয়োজন রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে নতুন ভারসাম্য
ট্রাম্প প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তে ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি নতুন আর্থিক কাঠামো দেখা যাচ্ছে। ওয়াশিংটন অস্ত্র সরবরাহের অনুমোদন দিচ্ছে, কিন্তু অর্থের বড় দায়িত্ব নিতে হচ্ছে ইউরোপ ও কানাডাকে।
এর আগে ইউক্রেনকে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের প্রযুক্তি বা লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছিল। তবে সে বিষয়ে চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, ইউক্রেনের জন্য অস্ত্র সরবরাহের পাশাপাশি রাশিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার পথও খোলা রাখার চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে সামরিক সহায়তা ও শান্তি আলোচনার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টি ওয়াশিংটনের নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে, ৫০০ প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রির অনুমোদন ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষার জন্য বড় পদক্ষেপ। তবে উৎপাদন ও সরবরাহে দীর্ঘসূত্রতা থাকলে যুদ্ধক্ষেত্রে এর তাৎক্ষণিক প্রভাব সীমিত হতে পারে। কিয়েভের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, ক্ষেপণাস্ত্রগুলো যত দ্রুত সম্ভব হাতে পাওয়া এবং শীতের আগে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
