ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ এবার নিজের মন্ত্রিসভার সদস্য ও শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়ে হাজির হয়েছেন সামরিক প্রশিক্ষণকেন্দ্রে। শুধু নীতিনির্ধারণ বা দপ্তর পরিচালনা নয়, দেশের নেতৃত্বকে আরও শৃঙ্খলাবদ্ধ, শারীরিকভাবে সক্ষম ও সংকট মোকাবিলায় প্রস্তুত করতে সামরিক বাহিনীর প্রশিক্ষণপদ্ধতি কাজে লাগাতে চান তিনি। এ উদ্দেশ্যে মন্ত্রী, উপমন্ত্রী এবং বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের নিয়ে সামরিক অনুশীলনে অংশ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নিজেও। আফ্রিকার এই দেশ যখন একাধিক অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংকট ও প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে এমন সামরিক প্রশিক্ষণ নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
২ নভেম্বর প্রকাশিত তথ্য ও ছবিতে দেখা যায়, আবি আহমেদ হুরসো সামরিক প্রশিক্ষণকেন্দ্রে মন্ত্রিসভার সদস্যদের সঙ্গে বিভিন্ন অনুশীলনে অংশ নিচ্ছেন। প্রশিক্ষণে ছিলেন ফেডারেশন হাউসের স্পিকার মুফেরিয়াত কামিল, অর্থমন্ত্রী ফিতসুম আসেফা এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী মেকদেস দাবাসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা। তবে প্রশিক্ষণ কবে শুরু হয়েছে, কত দিন চলবে কিংবা এর নির্দিষ্ট কর্মসূচি কী—সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
সামরিক শৃঙ্খলা থেকে প্রশাসনিক দক্ষতা অর্জনের লক্ষ্য
আবি আহমেদের বক্তব্য অনুযায়ী, ইথিওপিয়ার সর্বজনীন সমৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনে নেতৃত্বের শারীরিক সক্ষমতা, নৈতিক দৃঢ়তা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক প্রস্তুতি প্রয়োজন। তাঁর মতে, সামরিক প্রতিষ্ঠান থেকে শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম, দলগত কাজ, জবাবদিহি ও নেতৃত্বের মতো গুণ শেখার সুযোগ রয়েছে। এসব গুণ বেসামরিক প্রশাসনেও কাজে লাগতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী সামরিক ও বেসামরিক নেতৃত্বের কাজের মধ্যে একটি মিল তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্যের সারকথা হলো, সৈনিকদের যেমন নির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকে, বেসামরিক প্রশাসনেরও থাকে উন্নয়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনার লক্ষ্য। দুই ক্ষেত্রেই সফল হতে হলে পরিকল্পনা, দায়িত্ববোধ এবং দলগত প্রচেষ্টা জরুরি।
ইথিওপিয়ায় সাধারণত মন্ত্রী বা জ্যেষ্ঠ বেসামরিক কর্মকর্তাদের সামরিক প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়ার ঘটনা বিরল। ফলে এই উদ্যোগকে কেবল একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি হিসেবে নয়, বরং সরকারের নেতৃত্বের ধরন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় সামরিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে বৃহত্তর আলোচনার অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
একাধিক নিরাপত্তা সংকটের মধ্যে প্রশিক্ষণ
ইথিওপিয়ার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি বর্তমানে জটিল। উত্তরাঞ্চলের তিগ্রায় অঞ্চলে সংঘাতের পরও স্থায়ী রাজনৈতিক সমঝোতা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। আমহারা অঞ্চলে সরকারি বাহিনী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে লড়াই অব্যাহত রয়েছে। ওরোমিয়া অঞ্চলেও নিরাপত্তা অস্থিরতা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।
এসব সংঘাত শুধু সামরিক নিরাপত্তার বিষয় নয়; এর প্রভাব পড়ছে অর্থনীতি, স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়। সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে সরকারি সেবা পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয় এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বাড়ে। ফলে সরকারের জন্য একই সঙ্গে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং উন্নয়ন কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে।
এ পরিস্থিতিতে মন্ত্রিসভার সদস্যদের সামরিক প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকে সরকার সম্ভবত সংকট মোকাবিলায় নেতৃত্বের প্রস্তুতি বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। তবে সামরিক কায়দায় প্রশিক্ষণ নিলেই প্রশাসনিক সমস্যা সমাধান হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। নীতি বাস্তবায়ন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় জনগণের আস্থা অর্জন এবং সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধানও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ইরিত্রিয়ার সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ার প্রেক্ষাপট
ইথিওপিয়ার নিরাপত্তা উদ্বেগ শুধু দেশের অভ্যন্তরে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিবেশী ইরিত্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কও নতুন করে উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দুই দেশের মধ্যে অতীতে দীর্ঘ যুদ্ধ হয়েছে। ২০১৮ সালে শান্তিচুক্তির মাধ্যমে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সীমান্ত, আঞ্চলিক প্রভাব এবং লোহিত সাগরে প্রবেশাধিকার নিয়ে মতপার্থক্য বেড়েছে।
ইথিওপিয়ার সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের আকাঙ্ক্ষা এবং লোহিত সাগরে প্রবেশাধিকার নিয়ে আবি আহমেদের বক্তব্য প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ইরিত্রিয়া মনে করে, এ ধরনের বক্তব্য তাদের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। দুই দেশের মধ্যে নতুন সংঘাতের আশঙ্কা নিয়ে আঞ্চলিক পর্যবেক্ষকদের উদ্বেগও রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে সামরিক প্রস্তুতি ও জাতীয় নিরাপত্তা সরকারের বক্তব্যে বাড়তি গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে মন্ত্রীদের প্রশিক্ষণকে সরাসরি কোনো যুদ্ধপ্রস্তুতির প্রমাণ হিসেবে দেখার মতো তথ্য এখনো নেই।
উন্নয়ন, প্রশাসন ও সামরিক প্রভাবের ভারসাম্য
আবি আহমেদ দীর্ঘদিন ধরে ইথিওপিয়াকে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য তুলে ধরছেন। অবকাঠামো, শিল্পায়ন, কৃষি, জ্বালানি এবং পর্যটনে বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে তাঁর সরকার। কিন্তু সংঘাত, মূল্যস্ফীতি, ঋণের চাপ এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকট উন্নয়ন পরিকল্পনাকে কঠিন করে তুলেছে।
প্রশাসনের দক্ষতা বাড়াতে সামরিক প্রশিক্ষণ কিছু ক্ষেত্রে দলগত কাজ ও সংকট ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা দিতে পারে। তবে বেসামরিক প্রশাসনের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত আইন, জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং নাগরিক অধিকার। সামরিক শৃঙ্খলা ও বেসামরিক শাসনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নেতৃত্বের নতুন সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চান বলে জানিয়েছেন। কিন্তু এই উদ্যোগের বাস্তব সাফল্য নির্ভর করবে প্রশিক্ষণের ছবির বাইরে সরকারের নীতি বাস্তবায়ন কতটা উন্নত হয়, সংঘাত কতটা কমে এবং সাধারণ মানুষের জীবনে উন্নয়নের সুফল কতটা পৌঁছায় তার ওপর।
