প্রায় দুই দশক ধরে সোমালিয়ার নিরাপত্তা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার পর দেশটি থেকে সেনা প্রত্যাহার শুরু করেছে উগান্ডা। প্রথম দফার সেনারা ইতিমধ্যে দেশে ফিরেছেন। পর্যায়ক্রমে সব সেনা সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যার শেষ সময়সীমা ২০২৭ সালের শেষ ভাগ। আল-শাবাবের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সোমালিয়ার অন্যতম প্রধান নিরাপত্তা অংশীদার ছিল উগান্ডা। ফলে এই প্রত্যাহার শুধু একটি সামরিক মিশনের সমাপ্তি নয়; দেশটির নিরাপত্তা ব্যবস্থার দায়িত্ব ধীরে ধীরে নিজেদের হাতে নেওয়ার বড় পরীক্ষাও।
উগান্ডা ২০০৭ সালে আফ্রিকান ইউনিয়নের অধীনে সোমালিয়ায় প্রথম শান্তিরক্ষী বাহিনী পাঠায়। তখন দেশটির রাজধানী মোগাদিশুর বিভিন্ন এলাকায় আল-শাবাবের প্রভাব ছিল শক্তিশালী। সোমালিয়ার অন্তর্বর্তী সরকারকে রক্ষা করা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীটির অগ্রযাত্রা ঠেকানো ছিল মিশনের অন্যতম উদ্দেশ্য। পরবর্তী সময়ে উগান্ডার পাশাপাশি বুরুন্ডি, জিবুতি, কেনিয়া ও ইথিওপিয়ার সেনারাও বিভিন্ন পর্যায়ে এই নিরাপত্তা অভিযানে যুক্ত হয়।
প্রথম দফায় সেনা ফিরেছে, প্রত্যাহার চলবে ধাপে ধাপে
উগান্ডার সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ক্রিস মাজেজি জানিয়েছেন, সোমালিয়ার ফেডারেল সরকারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা চুক্তির আওতায় মোতায়েন থাকা সেনাদের প্রত্যাহার কার্যক্রম অবিলম্বে শুরু হয়েছে। প্রথম দলটি ইতিমধ্যে উগান্ডায় ফিরে গেছে। তবে প্রথম দফায় ঠিক কতজন সেনা ফিরেছেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
উগান্ডার প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান মুহুজি কাইনেরুগাবাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্যে দুই দশকের সামরিক ত্যাগ ও প্রাণহানির কথা উঠে এসেছে। তিনি বলেছেন, সোমালিয়ার নিরাপত্তার দায়িত্ব এখন দেশটির নিজেদের বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার সময় এসেছে।
তবে প্রত্যাহার মানে একসঙ্গে সব সেনা সরিয়ে নেওয়া নয়। উগান্ডার সেনারা দুটি পৃথক ব্যবস্থায় সোমালিয়ায় দায়িত্ব পালন করছেন। একদল রয়েছে সোমালিয়ার সরকারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আওতায়, অন্যরা আফ্রিকান ইউনিয়নের সমর্থন ও স্থিতিশীলতা মিশন—আউসোমের অংশ। প্রথম পর্যায়ে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আওতাধীন সেনাদের প্রত্যাহার শুরু হয়েছে। এরপর আফ্রিকান ইউনিয়নের মিশনে থাকা সেনারাও পর্যায়ক্রমে ফিরবেন। উগান্ডার পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ সব সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন হওয়ার কথা।
আল-শাবাবের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে উগান্ডার ভূমিকা
সোমালিয়ায় উগান্ডার সামরিক উপস্থিতির মূল কারণ ছিল আল-শাবাবের উত্থান ঠেকানো। আল-কায়েদার সঙ্গে সম্পর্কিত এই সশস্ত্র গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে সোমালিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ চালিয়ে আসছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় বোমা হামলা, আত্মঘাতী আক্রমণ এবং সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে তারা।
২০০৭ সালে আফ্রিকান ইউনিয়নের প্রথম সেনা পাঠানো দেশ হিসেবে উগান্ডা মিশনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে। উগান্ডার সেনারা মোগাদিশুর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও সরকারি প্রতিষ্ঠান রক্ষায় দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে আফ্রিকান বাহিনী আল-শাবাবকে রাজধানীর বড় অংশ থেকে সরিয়ে দিতে এবং কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ বিস্তারে সহায়তা করে।
তবে এই সাফল্যের মূল্যও দিতে হয়েছে। দীর্ঘ সংঘাতে উগান্ডার বহু সেনা নিহত ও আহত হয়েছেন। একই সঙ্গে সোমালিয়ার সাধারণ মানুষও সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলা, সামরিক অভিযান এবং বাস্তুচ্যুতির শিকার হয়েছেন। আল-শাবাব এখনো পুরোপুরি পরাজিত হয়নি। দেশটির গ্রামাঞ্চল ও কিছু গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে তাদের উপস্থিতি রয়েছে।
সোমালিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী কি প্রস্তুত?
উগান্ডার সেনা প্রত্যাহারের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, তাদের জায়গায় সোমালিয়ার নিজস্ব বাহিনী কতটা কার্যকরভাবে দায়িত্ব নিতে পারবে। কয়েক বছর ধরে সোমালিয়ার সেনাবাহিনীকে প্রশিক্ষণ, অস্ত্র ও সাংগঠনিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য, বিদেশি বাহিনীর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলা।
কিন্তু নিরাপত্তা বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ এখনো রয়েছে। বিভিন্ন অঞ্চলে বাহিনীর সমন্বয়, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, রসদ সরবরাহ এবং স্থানীয় পর্যায়ে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আল-শাবাবের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে শুধু সেনাসংখ্যা বাড়ানো যথেষ্ট নয়; প্রশিক্ষণ, নেতৃত্ব, যোগাযোগব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নও জরুরি।
সোমালিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের লোয়ার শাবেল অঞ্চলে আফ্রিকান ইউনিয়নের বাহিনীর উপস্থিতি কমে গেলে আল-শাবাব নতুন করে হামলার সুযোগ পেতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে। ওই অঞ্চলে কৌশলগত সড়ক, জনবসতি ও সামরিক অবস্থানের গুরুত্ব রয়েছে। সেনা প্রত্যাহারের গতি এবং স্থানীয় বাহিনীর প্রস্তুতির মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে নিরাপত্তার শূন্যতা তৈরি হতে পারে।
আফ্রিকান ইউনিয়নের মিশনের ভবিষ্যৎ
সোমালিয়ায় আফ্রিকান ইউনিয়নের নিরাপত্তা মিশনও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৫ সালের শুরুতে আগের অন্তর্বর্তী মিশনের জায়গায় আউসোম দায়িত্ব নেয়। এর লক্ষ্য সোমালিয়ার নিরাপত্তা বাহিনীকে সহায়তা করা এবং আল-শাবাবের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর সক্ষমতা বজায় রাখা। কিন্তু অর্থায়ন ও সদস্যদেশগুলোর সেনা সরবরাহ নিয়ে চাপ রয়েছে।
উগান্ডা এই মিশনের অন্যতম বড় সেনা সরবরাহকারী দেশ। দেশটির প্রায় সাড়ে চার হাজার সেনা আউসোমের আওতায় সোমালিয়ায় মোতায়েন রয়েছে বলে উগান্ডার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে। এত বড় একটি বাহিনী প্রত্যাহার করা হলে আফ্রিকান ইউনিয়নকে নতুন সেনা ও অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় সোমালিয়ার নিরাপত্তা অভিযানে প্রভাব পড়তে পারে।
প্রত্যাহার কি আত্মনির্ভরতার সূচনা, নাকি নতুন ঝুঁকি?
সোমালিয়া সরকারের কাছে বিদেশি সেনার ওপর নির্ভরতা কমানো একটি রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার। নিজস্ব বাহিনী নিরাপত্তার দায়িত্ব নিলে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ আরও দৃশ্যমান হবে। কিন্তু সেই পরিবর্তন সফল করতে হলে সেনা প্রত্যাহারের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ, অর্থায়ন ও নিরাপত্তা সমন্বয়ের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে।
উগান্ডার সেনা প্রত্যাহার তাই একদিকে সোমালিয়ার আত্মনির্ভরতার পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, অন্যদিকে নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য বড় পরীক্ষা। আল-শাবাবের তৎপরতা অব্যাহত থাকায় কোনো আকস্মিক শূন্যতা তৈরি হলে দুই দশকের সামরিক অভিযানে অর্জিত অগ্রগতি ঝুঁকিতে পড়তে পারে। ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ প্রত্যাহার সম্পন্ন হওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময় এই ভারসাম্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
