গৃহযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের দীর্ঘ যাত্রায় সোমালিয়ার পাশে ছিল জাতিসংঘ। রাজনৈতিক সমঝোতা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গঠন, নির্বাচন, মানবাধিকার এবং নিরাপত্তা খাতে তিন দশকের বেশি সময় ধরে কাজ করেছে সংস্থাটির একাধিক মিশন। অবশেষে ২০২৬ সালের ৩১ অক্টোবর শেষ হয়েছে জাতিসংঘের রাজনৈতিক মিশন ইউএনটিএমআইএসের কার্যক্রম। এর মধ্য দিয়ে ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি শুরু হওয়া জাতিসংঘের ধারাবাহিক রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান ঘটল। তবে মিশন বন্ধ হওয়ায় সোমালিয়া থেকে জাতিসংঘের সব কার্যক্রম শেষ হচ্ছে না; বরং দেশটির সঙ্গে কাজের ধরন ও দায়িত্বের কাঠামো বদলে যাচ্ছে।
সোমালিয়ার কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পর ১৯৯০-এর দশকে দেশটি দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, বাস্তুচ্যুতি এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর সহিংসতার মধ্যে পড়ে। রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা, প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠন এবং জাতীয় ঐক্য ফিরিয়ে আনা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। এই পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ ধাপে ধাপে রাজনৈতিক সহায়তা, শান্তি প্রতিষ্ঠা ও রাষ্ট্র পুনর্গঠনের কাজে যুক্ত হয়।
১৯৯৫ থেকে ইউএনটিএমআইএস: মিশনের দীর্ঘ পথচলা
সোমালিয়ায় জাতিসংঘের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার ধারাবাহিকতা শুরু হয় ১৯৯৫ সালে জাতিসংঘের রাজনৈতিক দপ্তর প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। পরে ২০১৩ সালে এর জায়গায় গঠিত হয় জাতিসংঘ সহায়তা মিশন ইন সোমালিয়া বা ইউএনএসওএম। দেশটির কেন্দ্রীয় সরকারকে শক্তিশালী করা, রাজনৈতিক সংলাপ এগিয়ে নেওয়া এবং ফেডারেল কাঠামো গঠনে সহায়তা করা ছিল এর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
পরবর্তী সময়ে সোমালিয়ার রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে জাতিসংঘের ভূমিকারও রূপান্তর ঘটে। ২০২৪ সালে নিরাপত্তা পরিষদ ইউএনএসওএমের পরিবর্তে দুই বছরের রূপান্তরকালীন মিশন ইউএনটিএমআইএস গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। ২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত এই মিশনের দায়িত্ব ছিল ধাপে ধাপে জাতিসংঘের রাজনৈতিক কার্যক্রম সোমালিয়ার নিজস্ব প্রতিষ্ঠান এবং জাতিসংঘের অন্যান্য সংস্থার কাছে হস্তান্তর করা।
৩১ অক্টোবর সেই রূপান্তরপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। মিশনের দায়িত্বের মধ্যে থাকা শাসনব্যবস্থা, সংবিধান পর্যালোচনা, জাতীয় পুনর্মিলন, নির্বাচনসংক্রান্ত সহায়তা, মানবাধিকার এবং আইনের শাসনের কাজ এখন সোমালিয়ার প্রতিষ্ঠান ও জাতিসংঘের দেশভিত্তিক বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে চালিয়ে যাওয়ার কথা।
কেন মিশন বন্ধের সিদ্ধান্ত
সোমালিয়ার ফেডারেল সরকার নিজস্ব রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক মিশনের ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য সামনে রেখে জাতিসংঘের রাজনৈতিক মিশনের কার্যক্রম শেষ করার অনুরোধ জানিয়েছিল। সরকারের দৃষ্টিতে, দেশটি এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি সংগঠিত রাষ্ট্রীয় কাঠামো গড়ে তুলেছে। তাই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দায়িত্বে জাতীয় প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব বাড়ানোর সময় এসেছে।
জাতিসংঘও দুই পক্ষের সম্মত রূপান্তর রোডম্যাপ অনুযায়ী মিশনের দায়িত্ব হস্তান্তরের কাজ করেছে। জাতিসংঘের কর্মকর্তারা বলেছেন, এই সমাপ্তি দুই পক্ষের অংশীদারত্বের অবসান নয়। বরং রাজনৈতিক মিশনের পরিবর্তে অন্যান্য জাতিসংঘ সংস্থা ও সোমালিয়ার নিজস্ব প্রতিষ্ঠান আরও সরাসরি দায়িত্ব পালন করবে।
তবে মিশন বন্ধের সময়টি রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল। দেশটিতে প্রেসিডেন্ট হাসান শেখ মোহামুদের মেয়াদ, সংবিধান সংশোধন এবং নির্বাচনের পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ রয়েছে। বিরোধী নেতাদের একাংশ প্রেসিডেন্টের ক্ষমতায় থাকার সময়সীমা ও সংসদের মেয়াদ বাড়ানোর উদ্যোগের বিরোধিতা করছেন। রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে সমঝোতা না হলে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নতুন সংকট তৈরি হতে পারে।
জাতিসংঘের মধ্যস্থতার ভূমিকা কি আর থাকবে না?
জাতিসংঘের রাজনৈতিক মিশন শুধু প্রশাসনিক পরামর্শ দিত না; বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের মধ্যে আলোচনার ক্ষেত্র তৈরিতেও ভূমিকা রাখত। ফেডারেল সরকার, আঞ্চলিক প্রশাসন, বিরোধী রাজনৈতিক নেতা এবং অন্যান্য অংশীজনের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিলে জাতিসংঘের কর্মকর্তারা সংলাপ ও সমঝোতায় সহায়তা করতেন।
মিশন বন্ধ হওয়ার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এই মধ্যস্থতার দায়িত্ব কে পালন করবে। এখন পর্যন্ত এমন কোনো বিকল্প কাঠামো নিয়ে রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে পূর্ণাঙ্গ সমঝোতা হয়নি। সোমালিয়ার বিরোধী নেতারা এবং কয়েকজন বিশ্লেষক আশঙ্কা করছেন, নির্বাচনী বিরোধ বা সাংবিধানিক সংকট দেখা দিলে নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে।
সরকার অবশ্য বলছে, রাজনৈতিক বিরোধ নিজেদের প্রতিষ্ঠান ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করার সক্ষমতা দেশটির রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে ফেডারেল সরকার ও আঞ্চলিক প্রশাসনগুলোর মধ্যে ক্ষমতা বণ্টন, সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং নির্বাচনী পদ্ধতি নিয়ে মতপার্থক্য এখনো রয়েছে।
নিরাপত্তা সংকট ও আল-শাবাবের হুমকি
সোমালিয়ার পুনর্গঠনের সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো আল-শাবাবের চলমান বিদ্রোহ। আল-কায়েদার সঙ্গে সম্পর্কিত এই সশস্ত্র গোষ্ঠী রাজধানী মোগাদিশুসহ বিভিন্ন অঞ্চলে হামলা চালিয়ে আসছে। সরকারি বাহিনী ও আফ্রিকান ইউনিয়নের সেনাদের বিরুদ্ধে আক্রমণের পাশাপাশি বেসামরিক মানুষ ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও তাদের হামলার লক্ষ্য হয়েছে।
জাতিসংঘের রাজনৈতিক মিশন বন্ধ হলেও সোমালিয়ার নিরাপত্তা খাতে আন্তর্জাতিক সহায়তা পুরোপুরি শেষ হচ্ছে না। আফ্রিকান ইউনিয়নের সেনাদের সহায়তায় জাতিসংঘের একটি পৃথক দপ্তর কাজ চালিয়ে যাবে। খাদ্য, জ্বালানি, চিকিৎসা, পরিবহন এবং অন্যান্য রসদ সরবরাহের মাধ্যমে এই দপ্তর আফ্রিকান বাহিনী ও সোমালিয়ার নিরাপত্তা কার্যক্রমকে সহায়তা করে।
তবে আন্তর্জাতিক সহায়তার অর্থায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। বিভিন্ন দেশের সহায়তা কমে গেলে নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যক্রম ও মানবিক সেবা দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এরই মধ্যে অর্থায়নের ঘাটতিতে সোমালিয়ার বেশ কিছু স্বাস্থ্য ও পুষ্টিসেবা কেন্দ্র বন্ধ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব বাড়লেও চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে
জাতিসংঘের রাজনৈতিক মিশন বন্ধ হওয়াকে সোমালিয়ার জন্য জাতীয় মালিকানা ও আত্মনির্ভরতার নতুন ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কিন্তু দীর্ঘদিনের সংঘাতের পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা সহজ নয়। নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, মানবাধিকার এবং ফেডারেল কাঠামোর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় এখনো অনেক কাজ বাকি।
জাতিসংঘের মিশনের বিদায় তাই একদিকে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের অগ্রগতির স্বীকৃতি, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতা ও সহায়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো হারানোর ঝুঁকি। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা, নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি এবং জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো না গেলে এই পরিবর্তনের সুফল সীমিত হয়ে যেতে পারে।
আগামী দিনগুলোতে সোমালিয়ার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে জাতিসংঘের রাজনৈতিক মিশনের অনুপস্থিতিতে রাজনৈতিক বিরোধ সামাল দেওয়া এবং আল-শাবাবের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা অভিযান অব্যাহত রাখা। তিন দশকের আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততার পর দেশটি এখন কতটা নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিজে পরিচালনা করতে পারে, সেটিই হয়ে উঠবে নতুন অধ্যায়ের মূল প্রশ্ন।
